সোমবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৮:১৯ পূর্বাহ্ন

“বাঁচাতে হবে কিন্ডার গার্টেন স্কুল গুলোকে”

শামীমা আফরিন মুক্তা

“ম্যাডাম আমি তিন দিন যাবত কিছু খাইনি” কথাগুলো বলছিলেন অঞ্জনা দাস- শিক্ষিকা, কিন্ডারগার্টেন স্কুল। স্বামী সমীর দাসও একই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক বললেন, “চাউল এখন আর কোন দোকানদার বাকি দেয় না, মুদি দোকানদার মুড়ি, বিস্কুটও বাকি দিচ্ছে না, অনেক টাকা বাকি হয়ে গেছে বলে। বেঁচে থাকার অবলম্বন কিছুই নেই, এক বছরের বেশি সময় বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ করে ধার দেনা শোধ করেছি এখন তাদের কিস্তি চালাতে পারছিনা বলে মামলার ভয় দেখাচ্ছে, সে কারণেই পালিয়ে এসেছি আপনার কাছে । আমাদেরকে বাঁচান, আমরা বাঁচতে চাই।”

জনপ্রতিনিধি হিসেবে এরা আজ আমার কাছে এসেছে। কিন্তু ১৮ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতার আলোকে এবং “বঙ্গবন্ধু কিন্ডারগার্ডেন স্কুল এন্ড কলেজ পরিষদ, বাংলাদেশ” এর চট্টগ্রাম মহানগর শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে আজ আমি লিখনী ধরতে বাধ্য হয়েছি।

শিশুরা উপযুক্ত রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে প্রতিপালিত হবে এবং শিশুদের বাগান হিসেবে কিন্ডারগার্টেন বাগিচায় রোপিত চারাগাছের ন্যায় পরিচর্যা পাবে। এ উদ্দেশ্য নিয়ে কিন্ডারগার্টেন সর্বপ্রথম স্থাপিত হয়। ফ্রেডরিক ফ্রোয়েবল ১৮৩৭ সালে এ শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। ১৮৪০ সালে “গার্ডেন অফ চিল্ড্রেন” নামে প্রথম কিন্ডারগার্টেন স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন।

২৪ জুলাই, ২০২১ ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়, বাংলাদেশের ৬০ হাজার কিন্ডারগার্টেন স্কুলের অর্ধেকই প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম, চাকরি হারিয়েছেন ৯৫ ভাগ শিক্ষক। এ সমস্ত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী সংখ্যা ছিল ৮০ লাখ, শিক্ষক রয়েছে প্রায় ১০ লাখ। কিন্ডারগার্টেন মালিক ও শিক্ষকদের অধিকাংশ এখন অনেকটা ত্রানের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন ।

ইট্যাবের মাসুম বিল্লাহর মতে, শিক্ষক নেতাদের অভিমত, শিক্ষার্থীদের মাসিক টিউশন ফি’র ৪০ শতাংশ বাড়িভাড়া,৪০ শতাংশ শিক্ষক-শিক্ষিকা, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন, বাকি ২০ শতাংশ দিয়ে গ্যাস বিল, বাণিজ্যিক হারে বিদ্যুত বিল ও পানির বিল সহ অন্যান্য খরচ নির্বাহ না হাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠানকে ভর্তুকি দিতে হয়। কিন্ডারগার্টেন স্কুলের ৯৯ শতাংশ ভাড়া বাড়িতে পরিচালিত হয়।

এই প্যানডেমিক সময়ে বঙ্গবন্ধু যদি বেঁচে থাকতেন তাহলে এই কিন্ডার গার্টেন স্কুল গুলোর শিক্ষকদের বাঁচানোর জন্য চোরের খনিদের কাছ থেকে টাকা আদায় করে এদের অন্ন জোগাড়ের ব্যবস্থা করে দিতেন। স্বাধীন বাংলাদেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সর্বপ্রথম বেসরকারি এ প্রতিষ্ঠানগুলো শুরু হয়েছিল আশির দশকে। বাংলাদেশের বর্তমানে এমন কোন সেক্টর নেই, যেখানের কোনো না কোনো কর্মকর্তা কিন্ডারগার্টেন স্কুলে লেখাপড়া করেননি। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের শিক্ষাকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য আশির দশক থেকে শিক্ষা ক্ষেত্রে এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর অবদান অনস্বীকার্য। স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তিতে বাংলাদেশ যখন উন্নয়নের রোল মডেলে পরিণত হতে যাচ্ছে, সেই সময় মরণঘাতী করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে দেশের লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আশঙ্কাজনক ভাবে বেকার হচ্ছে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকেরা। তাদের জীবনের করুন কাহিনী শুনলে, যে কারো গা শিউরে উঠবে। মাঝে মাঝে সংবাদ মিডিয়াগুলোতে শিক্ষকদের ফেরি করে সবজি বিক্রি করা লাইভ দেখানো ছাড়া তাদের পাশে কাউকে এগিয়ে আসতে দেখা যায়নি। নিজের অসহায়ত্ব থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য অনেক শিক্ষক আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। ক্ষুধার জ্বালা সহ্য করতে না পেরে মাক্স পড়ে সরকারি ত্রাণ সহায়তা নিতে দাড়িয়েছে রিলিফ লাইনে। পেশা পরিবর্তন করতে গিয়ে বিড়ম্বনার শিকার হয়েছেন অনেক শিক্ষক শিক্ষিকা । সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ঝড় তুলেছেন অনেকে “আমরা বাঁচতে চাই” । অনেক সময় তিন কেজি চাল, এক কেজি আলু, এক কেজি ডালের জন্য শিক্ষকেরা বিড়ম্বনার শিকার হয়েছেন। লকডাউন শব্দটি তাদের লাইফ ডাউনে পরিণত হয়েছে। কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎকারী বন খেকো ওসমান গনিরা কিন্তু জেল থেকে ছাড়া পেয়ে গেছে কিন্তু মানুষ গড়ার কারিগর গুলো আজ অর্থকষ্টের বেড়াজালে বন্দি । অন্যদিকে প্রায় ৩০ হাজার কিন্ডারগার্টেন বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম। একদিকে শিক্ষকদের পেটে ভাত নেই ,অন্যদিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভাড়া দিতে দিতে তারা আজ পথের ফকির। এসমস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর বাড়ির মালিক তথা জমিদারেরা অনেকেই বিন্দুমাত্র এক টাকা ভাড়া কম নেননি বরং অনেক প্রতিষ্ঠানকে বাসা ছেড়ে দিতে বাধ্য করেছেন। হাতে গোনা দুই একজন ভাড়া হয়তো সামান্য কমিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চেয়েছেন, তার হার ০.১ শতাংশের উপরে হবেনা ।আমি একজন শিক্ষককে বিগত রমজান মাসে ৫০ হাজার টাকা দিয়ে ফলফ্রুট ও একটি ভ্যান কিনে দিয়েছি ব্যবসা করার জন্য। তিনি আমার পায়ে ধরে সালাম করে বলেছেন, পৃথিবীটাকে আবার নতুন করে দেখব আপনার জন্য। এক শিক্ষককে তিন মাস আমার স্কুল ঘরের ক্লাসরুমে আশ্রয় দিয়েছিলাম। তিনি বলেছেন, বেঁচে থাকলে আর হয়তো শিক্ষকতা করবোনা। আরেক শিক্ষককে একটি কাঁচা ঘর বানিয়ে দিয়েছি, বলেছি ভাড়া দিতে হবে না যতদিন থাকো। মাস্টার্স পাস শিক্ষক নিজের পরিচয় গোপন রেখে দিনমজুরের কাজ করে, নিজের বাসা ভাড়া বাঁচিয়ে পরিবারের খাবার জোগাড় করছেন। তিনি আজও আমার আশ্রয় আছেন। বেকারত্বের সংখ্যা পাল্লা দিয়ে বাড়ছে, সংকুচিত হচ্ছে কর্মবীরদের কর্মসংস্থান। দেশ তথা মানুষ গড়ার কারিগরদের এরকম চিত্র অনেকেরই অজানা। তারা মিডিয়ার সামনে আসেন না, লোকলজ্জার ভয়ে। অন্যদিকে নিজেদের সত্যনিষ্ঠ বিবেক রক্ষা করার তাগিদে ধুঁকে ধুঁকে মরছে সবার অজান্তে ।ভ্যান নিয়ে ফেরি করতে গিয়ে যখন পুলিশের লাঠির আঘাতে তাদের শরীরের পেছনের অংশ রক্তাক্ত হয়, তখন অনেককে বলতে শুনেছি,” হে খোদা মৃত্যু কেন হয় না “। জীবন থেমে থাকে না, হয়তো একদিন সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকার খুলে দিবে। নতুন পৃথিবীর আলো দেখবে সকল শিক্ষার্থী। কিন্তু মাঝখান থেকে হারিয়ে যাবে অনেকগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং শত সহস্র গুণী শিক্ষক, যাদের হাত ধরে হয়তো আরও নতুন নতুন কর্ণধার সৃষ্টি হতো ।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, এদের দিকে একটু সুদৃষ্টিতে তাকান, এদের পাশে দাঁড়ান। আশা করি, এরা সারা জীবন আপনার প্রতি কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ থাকবে।

সবার প্রতি অনুরোধ ভাল থাকুন,সুস্থ থাকুন, সুস্থ রাখুন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন।

ফেসবুক থেকে সংগৃহীত

খবরটি অন্যদের সাথে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved dainikshokalerchattogram.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com