সোমবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৭:৫৮ পূর্বাহ্ন

স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা ঘোষণার জন্য কাজী জাফরের ১০ বছরের কারাদণ্ড হয়েছিল

  অধ্যাপক জসিম উদ্দিন চৌধুরী

  ১৯৬২ সাল থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সমকালীন রাজনীতিতে বহুল আলোচিত নেতা মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী  কাজী জাফর আহমদের ১ জুলাই জন্মদিন । সমসাময়িক কালে এমন সাহসী, দেশপ্রেমিক, জাতীয়তাবাদী, গণতন্ত্রমনা, ক্যারিসমেটিক, বাগ্মী, কুশলী, নির্লোভ, তাত্ত্বিক, নির্যাতিত কৃষক শ্রমিক জনতার স্বার্থ রক্ষাকারী ও ব্যক্তিত্ববান প্রভৃতি গুণের সমাহারে একজন নেতা পাওয়া খুবই দুস্কর। 
জননেতা কাজী জাফর আহমদের রাজনৈতিক উত্থান কোন সহজ সরল বা উত্তরাধিকার সূত্রে হয়নি। স্কুল, কলেজে, বিশ্ববিদ্যালয়ে, কৃষকের ঘরে ঘরে, শিল্প প্রতিষ্ঠানে ও শ্রমিকের বস্তিতে সহ সমগ্র দেশের পথে প্রান্তরে চারনের বেশে ঘুরে ঘুরে ছাত্র-শ্রমিক-কৃষক জনতাকে সংগঠিত করে দেশের বৈপ্লবিক পরিবর্তনের মাধ্যমে বাংলাদেশে একটি সুখী সমৃদ্ধশালী শোষনহীণ সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করার স্বপ্ন দেখেছিলেন।
কাজী জাফর আহমদ ১৯৩৯ সালে ১ জুলাই সোনার চামচ নিয়ে জন্মগ্রহন করেও  চলেছিলেন বন্ধুর পথে জনগণের স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে।
তিনি ১৯৬২ সালে আইয়ুব খান ও শরীফ কমিশনের নতুন শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনে অসাধারণ নেতৃত্ব দেন।১৯৬৮ সালের ডিসেম্বরে গর্ভনর হাউজ ঘেরাও, হরতালের পর হরতাল, জনসভা দিয়ে মাওলানা ভাসানী শেখ মুজিবের মুক্তি ও গণঅভূত্থানের সফল করার পেছনে সংগঠিত শক্তি হিসেবে কাজী জাফরের নেতৃত্বাধীন বাংলা শ্রমিক ফেডারেশন এর বিশেষ করে টঙ্গির শ্রমিক সমাজের সম্পৃক্ততা উল্লেখযোগ্য। সেই সময় কাজী জাফর টঙ্গির শ্রমিকদের নিয়ে শিল্পাঞ্চল ঘেরাও করে শ্রমিকদের অধিকার আদায় এবং জাতীয় রাজনীতির স্রোতধারায় একাকার করে দিয়েছিলেন।আর ‘৬৯ এর ছাত্র সংগ্রাম পরিষদে কাজী জাফর সমর্থিত  ছাত্র ইউনিয়নের মোস্তফা জামাল হায়দার ও মাহবুব উল্লাহর ভূমিকা নতুন করে উল্লেখ নিষ্প্রয়োজন।   ১৯৬২ থেকে প্রতিটি সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় কাজী জাফর ১৯৭০ সালের ২২ শে ফেব্রুয়ারী পল্টন ময়দানে জনসভায় স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলার ঘোষণা দেন। সেজন্য পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠি কাজী জাফরকে ৭ বছরের জেল ও ১০টি বেত্রাঘাতের নির্দেশ দেন।  
 কাজী জাফর এবং তার নেতৃত্বাধীন নেতাকর্মীরা সেক্টর কমান্ডারদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে প্রায় ৪০ হাজার সদস্য নিয়ে গেরিলা বাহিনী গঠন করেন। মান্নান ভুইয়ার নেতৃত্বে শিবপুরে ট্রেনিং ফিল্ড ও হেডকোর্য়াটার এবং অন্যান্য নেতাদের নেতৃত্বে ১৪টি মুক্তাঞ্চল গড়ে তুলে ছিল। 
তিনি স্বাধীনতার পর প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।  তিনি ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক এবং পরে ইউপিপির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন।  ১৯৭৭ সালে জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট গঠনে গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা রেখে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছেন। ১৫ দলীয় জোটের পাশাপাশি বিএনপিকে নিয়ে ৭ দলীয় জোট গঠন করে এরশাদের সামরিক শাসন বিরোধী তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে। পরে তার অতীত রাজনীতির প্রতি অবিচার করে সামরিক শাসন প্রত্যাহার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় এরশাদের অঙ্গীকারে বিশ্বাস করে জাতীয় ফ্রন্টে যোগদান করেছিলেন। পরে জাতীয় পার্টি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। সে সময় কাজী জাফর ভুমি সংস্কার কার্যক্রম, ভুমিহীনদের খাস জমি বিতরণ, গুচ্ছ গ্রাম, ৬ হাজার কোটি টাকার কৃষি ঋণ মওকুফ, জাল যার জল তার সহ বিভিন্ন গণসম্পৃক্ত কাজে সরকারী সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ ভুমিকা রাখে।
বিভিন্ন সময়ে তিনি মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী হলেও অর্থের প্রতি লোভ, বিত্তবৈভবে বিলাস ব্যসনে তিনি গা ভাসিয়ে দেয়ার লোক ছিলেন না। সে কারণে চিকিৎসার জন্যও তাকে অনেক অসুবিধার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। সর্বোচ্চ রাস্ট্রীয় ক্ষমতায় থেকেও এবং বিখ্যাত ব্যবসায়ীর সন্তান হওয়া সত্ত্বেও মৃত্যুকালে একটি ফ্ল্যাট  ছাড়া পরিবারের জন্য আর কিছু রেখে যেতে পারেন নি।
২০১৪ সালে নির্বাচন নিয়ে জাতীয় পার্টি  এরশাদ ও কাজী জাফরের নেতৃত্বে বিভক্ত হলে তাঁর নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি   ২০ দলীয় জোটে অংশগ্রহণ করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম জারী রেখেছিলেন। জনগণের অধিকার আদায়ের প্রতিটি সংগ্রামে অংশগ্রহনকারী জননেতা কাজী জাফর আহমদ বিশ্বাস করতেন জনগণের আন্দোলন বৃথা যায় না। তাঁর বিশ্বাস গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে সুখী সমৃদ্ধশালী গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠনের স্বপ্ন একদিন বাস্তবায়ন হবেই।
কাজী জাফর সম্পর্কে নেতাদের মূল্যায়ন কিরকম দেখা যাক।
বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেন,  “তার মন সব সময় অস্থির থাকত দেশের স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্রের জন্য। রাজনীতিকে তিনি মনেপ্রাণে ভালোবাসতেন। গণমানুষের জন্য রাজনীতি করতেন তিনি। মওলানা ভাসানীর যোগ্য উত্তরসূরি ছিলেন কাজী জাফর আহমেদ।”
আ,স.ম. রব বলেন, “কাজী জাফর ছিলেন দূরদর্শী রাজনীতিবিদ। তিনি ছিলেন অসীম সাহসী আর কৌশলী।  রাজনীতিবিদরা অনেকেই কাজী জাফরের কাছে রাজনীতি শিখেছেন। সেই অর্থে তিনি ছিলেন রাজনৈতিক গুরু।”
নোবেল বিজয়ী  মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, “সে আমার বিশেষ বন্ধু ছিল। চট্টগ্রাম থেকে একটা পিআইয়ের ফ্লাইট ছিল ঢাকায় আসার মাঝখানে কুমিল্লায় থামত। একটা ফ্লাইটে আমি চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আসছি, কুমিল্লায় থামল। কুমিল্লা থেকে ঢাকার যাত্রী উঠাল।তার মধ্যে লক্ষ্য করলাম দাঁড়ি-গোফওয়ালা একজন চাদর গায়ে আমার দিকে তাকাতে তাকাতে ঢুকল। আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না-কেন তাকাল? যেই আমার পাশে আসল-মাথা নিচু করে বলল, আমি কিন্তু আন্ডারগ্রাউন্ডে আছি, আপনি কিছু বলবেন না। আমি এইমাত্র চিনলাম, আগে তো বুঝিনি…এই হচ্ছে কাজী জাফর।তখন বুঝলাম যে, আন্ডারগ্রাউন্ডটা কি জিনিস।”
 বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “জাফর ভাই অসাধারণ নেতা ছিলেন,  আমাদের কাছে নায়ক  ছিলেন। সত্যি উনি একেবারে কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকতেন। তিনি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা উজ্জ্বল নক্ষত্র, উনি সব সময় উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো রাজনীতিতে বিচরণ করছেন।”কাজী জাফর আহমদের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্কের একটি ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে বিএনপি মহাসচিব বলেন, “আমরা জাতীয় পার্টিসহ তাঁকে আমাদের জোটে আনার জন্য কাজ করছিলাম।  প্রথম যে সভাটা উনি আমাদের ম্যাডামের সঙ্গে করতে গেলেন সেটা খুব স্মরণীয়। তখন সরাসরি ম্যাডামের সাথে দেখা করাটা তার জন্যে বিপজ্জনক ছিল।কারণ দলীয় প্রধান ও অন্যান্যরা জানতে পারলে তার ক্ষতি হতে পারে।  আচকান পরা, মাথায় টুপি, মুখে দাঁড়ি সমেত একজন এসে আমাকে বললেন, কি চিনতে পারছ? আমার বেশ কিছু সময় লাগছে চিনতে। এরপর গাড়ি বদল করে ম্যাডামের বাসায় গিয়েছিলাম। জাফর ভাইকে সেদিন ম্যাডামও চিনতে পারেননি। ম্যাডাম বললেন, কাকে নিয়ে এলেন? উনাকে কিন্তু চিনতে পারছি না।”
রাশেদ খান মেনন বলেন, “জাফর ভাইয়ের সাথে আমার যে সম্পর্ক এটা দীর্ঘকালের একটা অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। ছাত্র আন্দোলন থেকে শুরু করে শ্রমিক আন্দোলন, বাংলাদেশের মুক্তির আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রামের আন্দোলন- সব ক্ষেত্রে আমরা প্রায় একত্রে পথ চলেছি।“আমাদের সম্পর্কটা এতোই অবিচ্ছেদ্য ছিল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় যখন আমরা ভারতে আশ্রয় নিয়ে এই লড়াইয়ে ক্ষেত্র সংগঠিত করার চেষ্টা করছি, সে সময়ে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা কমরেড মুজাফফর আহমদের সাথে আমার দেখা হওয়ার সুযোগ হয়েছিল। কমরেড মুজাফফর আহমদ আমাকে দেখে বললেন, ‘জাফর-মেনন এসেছেন। আমি বললাম জি না, আমি মেনন, কাজী জাফর আরেকজন। উনি বললেন, ওহ জাফর-মেনন একটি নাম নয়।”মেনন বলেন, “আমার  মনে আছে, ১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৬২ সালে শিক্ষা আন্দোলনে যখন গুলি হল তখন ওয়াজিউল্লাহ, মামুন মোস্তফা মারা গেলেন। সেখানে  লাশের সামনে দাঁড়িয়ে যে বক্তৃতা করেছিলেন, আমার মনে আছে ওখানে দাঁড়ানো সমস্ত মানুষ কেঁদে দিয়েছিল। এতোদূর তার বক্তৃতার প্রভাব ছিল।“ভিন্ন পথযাত্রায় আমরা স্বাধীনতার সূর্য দেখেছিলাম। সেই পথযাত্রায় আমাদের নেতা ছিলেন কাজী জাফর আহমেদ যাকে আমরা চিরকাল স্মরণ করি।”‘৬৯ এর গণ অভ্যুত্থানের নেতা ও অর্থনীতিবিদ মাহবুব উল্লাহ বলেন,”১৯৬২ এর ছাত্র আন্দোলনে কাজী জাফর আহমেদের নেতৃত্ব অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। ১৭ সেপ্টেম্বর  হরতালের কর্মসূচি চলছে।বেলা ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত আমতলায় ছাত্র গনজমায়েত। তিনি ছিলেন অনলবর্ষী বক্তা। তার বক্তৃৃতায় ছাত্রছাত্রীরা কখনও ডুকরেকেঁদে উঠত। আবার কখনও স্লোগানে স্লোগানে বজ্রনিনাদ তুলত। তার বক্তৃতারমোহময়ী আকর্ষণ এতই প্রবল ছিল যে, একদিকে কান্না, অন্যদিকে ক্রোধেরউচ্চারণ আকাশ-বাতাসকে কাঁপিয়ে তুলত। তার বক্তৃতায় ছিল ইতিহাসবোধ ও আবেগেরঅভূতপূর্ব সংমিশ্রণ। তিনি যখন আইয়ুবের সামরিক শাসনের সময় লাহোর দুর্গেরঅন্ধ প্রকোষ্ঠে কমরেড হাসান নাসিরের ওপর নির্যাতনের কাহিনী এবং এর ফলেতার প্রাণত্যাগের ঘটনা বর্ণনা করতেন, তখন চোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠত। তিনিবলতেন কমরেড আবদুল বারীর নির্যাতনের কথা। বলতেন বেলুচিস্তানে ঈদেরজামাতের নৃশংস বোমাবর্ষণের কথা। তার বক্তৃতায় অত্যাচারীর অত্যাচার চরমথেকে চরমতর রূপে প্রতিভাত হয়ে উঠত। কার্ল মার্কস মেহনতি মানুষেরবিদ্রোহকে অবশ্যম্ভাবী করে তোলার জন্য এমন বক্তব্যগুণের প্রয়োজনীয়তার কথাবলেছিলেন। ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে মেয়াদ শেষে তিনিটঙ্গীর শ্রমিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে এ রকম দুঃসাহসিকশ্রমিক আন্দোলনের নজির খুব একটা নেই। অর্থ লোভ তার ছিল না। মৃত্যুর সময় তিনি ছিলেন প্রায় কপর্দকশূন্য।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে কাজী জাফর সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ব্রত নিয়ে রাজনীতি শুরু করলেও বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের বিপর্যয়ে লক্ষ্যচ্যুত হয়েছেন। তাছাড়া সে দিন যে চ্যালেঞ্জ নিয়ে জাতীয় ফ্রন্টে যোগদান করেছিলেন তাতে আংশিক সফল হয়েছিলেন, পুরোপুরি নয়। কারণ এরশাদ সেদিন সামরিক শাসন প্রত্যাহার করলেও সত্যিকার নয়, নামেমাত্র গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।সাবেক প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় নেতা, কিংবদন্তী ছাত্র ও শ্রমিক নেতা কাজী জাফর মুক্তিযুদ্ধে, প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে এবং জনকল্যানে অনন্য ভূমিকার জন্য বাংলাদেশের ইতিহাসে চির স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
লেখক: কলামিষ্ট ও রাজনীতিবিদ

খবরটি অন্যদের সাথে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved dainikshokalerchattogram.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com