শনিবার, ২৪ জুলাই ২০২১, ১১:৪১ পূর্বাহ্ন

সত্তার ঘাটের রূপ-অপরূপ

জাকারিয়া কাজী

ঘাট মানে খাল-নদী পারাপারের মিলন মেলা।নদীমাতৃক বাংলাদেশে ( পাকিস্তান আমলে)একসময় ঘাট ছিল অগুনিত। এখন তেমনটি চোখে পড়েনা।ঘাটের পরিধি বেড়ে যাওয়ায় কিংবা নৌকার পাশাপাশি ষ্টীমার চলাচলের সুযোগ পাওয়ায় অনেক ঘাটকে সময়ের ব্যবধানে ‘গন্জে’ পরিনত করা হয়েছিল। কিন্তু “সত্তারঘাট” এখনো সেই চিরাচরিত রূপ-লাবন্য ধরে রেখেই ঠায় দাড়িয়ে আছে।
চট্টগ্রাম -রাঙ্গামাটি সড়কেই এই সত্তার ঘাটের অবস্হান। আগেকার কলকাকলি এখন চোখে না পড়লেও একসময় এ ঘাটেই লেগে থাকতো ভীড়।নদীর উপর সেতু ছিলনা বলেই নদী পারাপার কিংবা খেয়াঁ নৌকার মাঝি মাল্লার হাক-ডাক ছিল এ ঘাটের অনন্য রূপ,আকর্ষন। পারাপারের জন্য ছিল জোড়া নৌকা–যা সাধারণ ভাষায় বলতো “জুড়িন্দা”। মুড়ির টিনের মত গাড়ীগুলো রাস্তা থেকে নেমে “জোড়িন্দার উপর এসে দাড়াতো,আর মাঝিমাল্লারা রশি টেনে নিয়ে যেত ওপারে।এবং সেখান থেকে কাদঁতে কাদঁতেই সবার ধাক্কা খেয়েই রাস্তার উপর উঠতো গাড়িগুলো। ঘাটের একপাশে রাউজান, আর অন্যপাশে হাটহাজারী। গ্রামীন জনপদ বলেই গাড়ির চাপ খুব একটা ছিলনা।মাইলের পর মাইল হাটতো এলাকার মানুষ। রাউজান অংশে ছিল বৌদ্ব ধর্মাবলম্বীদের বাস। দেশের প্রথিতযশা আয়ুর্বেদীয় প্রতিষ্টান “মঘাশাস্ত্রী ঔষধালয়”টি ছিল এখানে।মঘাশাস্ত্রী বাস ষ্টেশান ছিলো এলাকায় জনপ্রিয়। চট্টগ্রামের রাস্তা ঘাট সংস্কারের ইট তৈরীর বিশাল কর্মযজ্ঞও দেখেছি এখানে। গহিরার “সত্তার ঘাট ব্রিকফিল্ড” নামের বিশাল ব্রিকফিল্ড থেকেই ইট যেত সারা চট্টগ্রামে।ঘাটের হাটহাজারী অংশে ছিল “হাট”–যা নদীর পাড় থেকে লম্বালম্বিভাবে দক্ষিনে বিস্তৃত ছিল। সারাক্ষণ মাঝিমাল্লা আর হাটুরেদের পদচারনায় মুখর থাকতো হাট আর ঘাট।
নাঙ্গলমোড়া, ছিপাতলী,কোতোয়ালী ঘোনা, অংকুরী ঘোনা,মাদার্সা,গড়দুয়ারা থেকেও হাটুরে আসতেন হাটে।কেউ কেউ নদীর পাড় ধরে,আবার কেউ কেউ নৌকায় চড়ে আসতেন হাটে।যাত্রীবাহী নৌকার সাথে পালতুলে চলতো পণ্যবাহী বড় বড় নৌকা।
সম্ভবতঃ যুক্তফ্রন্ট আমলেই সত্তার ঘাটের উপর “সেতু” (পুল) আসে। রাউজানের বর্তমান সাংসদ ফজলে করিম চৌধুরীর পিতা যুক্তফ্রন্ট আমলের তখনকার সাংসদ ও আইন প্রনেতা জনাব একেএম ফজলুল কবীর চৌধুরীর হাত দিয়েই সেতুটির গোড়াপত্তন হয়েছিল বলে জেনেছি।
ভাঙ্গনের কবলে পড়ে হাটটি একসময় পুলের পাশে মহাসড়কের উপর উঠে আসে।স্বাধীনতার পর এটা “বাংলা বাজার”নামেও পরিচিতি পায়।
রাস্তার উপর পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় এই হাটটি একসময় মুখ থুবরে পড়ে।এবং পরবর্তীতে হাটটি ইছাপুর মাদ্রাসার দিকে ধাবিত হয়।লোক সমাগম বৃদ্বি পাওয়ায় ইছাপুরে বেড়ে যায় ক্রেতা বিক্রেতার কলকাকলী। এবং একসময় সত্তার ঘাটের সেই জনপ্রিয় হাটটি “ইছাপুর বাজার”র স্হায়িত্বের মর্যাদা পায়।
সত্তার ঘাটের কোলে ছিল অনেক স্মৃতি। চওড়া নদীর কিনারায় জেলেরা গাছের ডাল দিয়ে ‘জাগ” দিতেন,জোয়ারে বসিয়ে দিতেন জাল, ভাটার টানে পানি কমে গেলে জালে আটকা পড়া মাছগুলি ধরা হতো। “রুই, কাতলা,মৃগেল মাছগুলো এই হালদা নদীতেই ডিম দিত।সত্তার ঘাট থেকে গড়দুয়ারা পর্য্যন্ত ছিল মাছের অভয়ারণ্য। বর্ষায় হালদা জুড়ে থাকতেো “জেলে, জাল আর নৌকা। ডিম সংগ্রহ করার কী এক অদ্ভুত সৌন্দর্য, প্রতিযোগীতা।ঝড়,বৃষ্টি,বজ্রপাত– কোন কিছুতেই তারা দমে যাবার পাত্র নন। নদীর পাড়ে পাড়ে খনন করা হতো ‘পরিখা’। পরিখায় ডিম রেখে চলতো পোনা উৎপাদন ও বিক্রি। একসময় বন্যায় পানিতেও আমরা পোনা দেখতাম। নিচু পুকুরগুলোতে ঢুকে পোনাগুলি বড় হতো। মা মাছ পাহারায় তখনও পুলিশের পাহারা বসতো।কিন্তু তাদের ফাঁকি দিয়েই রাতের আধাঁরেই মাছ ধরতো নদী পাড়ের মানুষ।বাড়ি বাড়ি গিয়ে কুপিবাতির আলোতেই বিক্রী করতো মাছ।১২/১৩ সের ওজনের মাছ আমাদের বাড়ীতে আনলে অনেকেই শেয়ার করেই কিনতেন। সেই হালদায় এখনো মা মাছ ডিম দেয়।প্রাকৃতিক পরিবেশে এমন ডিম দেয়ার ইতিহাস বিশ্বে বিরল। সম্প্রতি হালদাকে “হ্যারিটেজ “ঘোষনা করেছে সরকার,এ ঘোষনার মধ্যদিয়েই নুতনত্ব লাভ করছে মাছের এই হালদা অভয়ারণ্য।পুলের উপর দাড়িয়ে নৌকা খেলা দেখার মজা বুঝানো মুশকিল।দুর দূরান্ত থেকে আসতো নানা রংয়ের ছোট বড় নৌকা।
এলাকাকে সমৃদ্বশালী করতে নানা উদ্যোগ নিয়েছেন রাউজান সাংসদ ফজলে করিম চৌধুরী। নুতন একটি আধুনিক “সেতু”পেতে যাচ্ছে এলাকাবাসী।পুরানো পুলটি তার অতীত ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারে–এমন চিন্তা নাকি সাংসদের মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। ভ্রমন পিপাসুরা এখানে এখনো ভীড় করেন। পর্যটকরা স্বস্হিতেই এখানে পরিবার নিয়ে দাড়ান। স্মৃতির তাড়নায় মাঝে মাঝে জ্বলে উঠে তাদের ক্যামরার ফ্লাশ।
এখান থেকেই আজ রাউজান সাংসদ ফজলে করিম চৌধুরীর নেতৃত্বে বিশাল এক ম্যারাথন দেখল দেশবাসী।সত্তার ঘাট আজ নুতন ইতিহাস লিখলো।

খবরটি অন্যদের সাথে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved dainikshokalerchattogram.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com