মঙ্গলবার, ২৭ জুলাই ২০২১, ০২:০৮ পূর্বাহ্ন

রাউজানে ৬৯-৭০ সময়কার পত্রিকার বঙ্গবন্ধু পাগল হকার শফি

টরেন্টো থেকে মারুফ শাহ চৌধুরী

রাউজানে ৬৯-৭০ সেসময়কার পত্রিকার বঙ্গবন্ধু পাগল হকারশফি। আজকে মাঝে মাঝে ছাত্রলীগ নেতাদের জন্মদিন পালন বিভিন্ন আয়েসী জীবনযাপন শোনা যায়।আমাদের সময়আমরা কল্পনা করতে পারিনি। সেসময় গহিরার যারা ছাত্রলীগ বা আওয়ামী লীগ করত তারা ছিল নিবেদিতপ্রাণ।হাতের ঘড়ি মায়ের স্বর্ণালঙ্কার বাজারে বন্ধক দিয়ে আমরা গহিরা হাইস্কুলে সত্তর সালে ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে নাটক করেছিলাম ঝড়ে ভাঙ্গা নীড়। নাটক য়ে গহিরা হাই স্কুলের শিক্ষক মরহুম হারুনুর রশিদ এবং বাবু মনোরঞ্জন চক্রবর্তী মাস্টার বিভূতিভূষণ অভিনয় করেছিল। এই নাটকের প্রথম নারী চরিত্রে নারী অভিনয় করে ছিল শ্যামলী নামে জৈন কা নাট্য অভিনেত্রী নায়িকার পাট করেছিল। গহিরা হাই স্কুলের মাঠ নাটক দেখিবার জন্য জনসমুদ্র হয়েছিল। দূরদূরান্ত থেকে বহু ছাত্র-জনতা এই নাটক দেখার জন্য এসেছিল। আমি ডাক্তারের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলাম ছোট একটি দৃশ্য। কালাচাঁদ চৌধুরীহাটের হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার সুখেন্দু বিকাশ থেকে আমি একটি ইনজেকশন এনেছিলাম। বিরাট ইনজেকশন সিরিজ। নায়িকার হাতে পুশ করছিলাম। এত বড় ইঞ্জেকশান দেখে দর্শকরা হাসাহাসি করেছিলাম। সামনের সারিতে বসে ছিল রাউজানের একমাত্র হকার শফি। লম্বা চেহারা। সব সময় পান খেত। লম্বা চুল সকালবেলায় রাউজান ফকিরহাটের এবং গহিরা পশ্চিম গহিরা সব জায়গায় সে পত্রিকা সরবরাহ করতো। মাথার লম্বা চুল উড়িয়ে সাইকেল চালাইয়া সে পত্রিকা বিতরণ করত। সে সময় ঢাকার পত্রিকা মফস্বলে একদিন পরে আসত। সবচেয়ে বেশি চলত দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকা। গহিরা মনি বাবুর সেলুন আমাদের ছাত্রলীগ এবং গহিরা আওয়ামী লীগ কর্মীদের আড্ডা ছিল। মনি বাবু একজন সুরুচিসম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন। সেলুনের ফাঁকে ফাঁকে তিনি ডাকঘরের এর রানার কাজ করতেন। তিনি রাউজান থানা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক ছিলেন। তিনি দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকা রাখতেন। তার পাশে ছিল পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ গহিরা শাখা অফিস। কলেজ চলাকালীন ছুটির সময় অনেকে অফিসে আনতাম এবং সেখানে রাজনৈতিক আলোচনা চলত। শফি আমাদের পত্রিকা দিয়ে যেত। রাউজান মুন্সির ঘাটা তার পত্রিকা দোকান ছিল। রাউজান কলেজ এর ছাত্র সংসদ নির্বাচনে গহিরা থেকে আমরা গিয়ে ওখানে দলভারী করতাম বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়ন নেতাকর্মীরা গহিরা থেকে রাউজানে যেত। শফীর সাথে আমার খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। আমাকে শেষ সাপ্তাহিক পত্রিকা বিচিত্রা খুদে ম্যাগাজিন সরবারহ করতো। কারণ আমি কিশোর বয়স থেকে পত্রিকা পড়া আমার একটি নেশা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। পিতার সরকারি চাকুরী করার সুবাদে তখন লাকসাম দৌলতগঞ্জ বাজারে যেখানে ইত্তেফাকের কপি থাকতো সেসব দোকানে গিয়ে খাতির জমিয়ে পুরো পত্রিকা পড়ে নিতাম বিশেষ করে ইত্তেফাকের মুসাফিরের মঞ্চে নেপথ্যে আমার খুব প্রিয় ছিল। যাক সেই পত্রিকা নেশা হতে শফীর সাথে আমার খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। একজন ছাত্র নেতা হিসাবে আমাকে শহীদ নাজিম, শফি , বীর মুক্তিযুদ্ধা আহসানুল্লাহ কামাল মিয়া সবার সাথে তার সম্পর্ক ছিল। জানিনা সে এখন বেঁচে আছে কিনা। ১৫ ই আগস্ট বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর সে পাগলের মত হয়ে যায়। আমি ৭৬ ইংরাজিতে কি একটা কাজে রাউজান গেছিলাম তখন সে দেখি তার দোকানের সামনে সেসময়ের সংসদ সদস্য অধ্যাপক খালেদ চট্টগ্রামের প্রাচীন দৈনিক আজাদী সম্পাদক এবং যিনি বাকশালের গভর্নর হয়েছিলেন। তার সম্পর্কে শফি অশালীন মন্তব্য করতেছে। আমি অবাক হয়ে গেলাম। তাকে জিজ্ঞেস করলাম হে শফী তুমি খালেদ সাহেবকে গালাগালি করছ কেন। দেখি একেবারে পাগলের মত তার মাথার চুলগুলি সব উস্কোখুস্কো। সে বলল তার দোকানের সামনে দিয়ে খালেদ সাহেবের গাড়ি গিয়েছে খালেদ সাহেবের পাশে বঙ্গবন্ধুর খুনি তাহের উদ্দিন ঠাকুর বসা বঙ্গবন্ধু যাকে ডাস্টবিন থেকে তুলে এনে মন্ত্রী বানিয়ে ছিলেন। সে আমাকে বলল তাহেরউদ্দিন ঠাকুরকে খালেদ সাহেব কেন পাশে বসিয়েছে। তাহেরুদ্দিন ঠাকুর তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন এবং সাংবাদিক হিসেবে খালেদ সাহেবের পূর্ব পরিচয় ছিল। সেই পরিচয়ের সূত্র তাহের উদ্দিন ঠাকুর চট্টগ্রাম আসলে খালেদ সাহেব তাকে নিয়ে রাউজান এসেছেন এই শফি এ দৃশ্যসহ্য করতে পারে নাই। সামান্য পত্রিকা হকার গায়ে তার ছেড়া জামা থাকতো। সে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। আমি তাকে সান্তনা দিতে পারি নাই। ৭৭ সালে আমরা রাজনীতি ছেড়ে দিই। যুদ্ধ করে যখন ভারত থেকে আসলাম সেসময় জননেতা আব্দুল আল হারুন আমাকে আর শফীকে তার শহরের দেওয়ানবাগ চন্দনপুরা মোবারক মঞ্জিলে আমাদের ডেকেছিলেন বললেন তোরা পার্টির জন্য অনেক কিছু করেছিস। এখন কি চাকরি করবি। আমি তোদের চাকরি দিতে পারব। আমি আর শফি বলেছিলাম ধন্যবাদ হারুন ভাই। আমরা সবে মাত্র বিশ্ববিদ্যালয় অনার্সে ভর্তি হয়েছি। আমাদের গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন হয় নাই। আমর লেখাপড়ায় ফিরে যাব। আপনি আমাদের জন্য দোয়া করবেন। প্রিয় পাঠকবৃন্দ সেসময়কার অবস্থা আজকের অবস্থা তুলনা করে দেখুন। টেন্ডার চাঁদাবাজি কি জিনিস আমরা যারা ছাত্রলীগ করতাম স্বপ্ন ভাবি নি এগুলো যে ছাত্র রাজনীতি করলে পয়সা পাওয়া যায়। কোন মিটিয়ে যাচ্ছি সবাই দল বেধে গাড়িতে উঠে পড়ছি স্লোগান দিচ্ছে সবাই জয় বাংলা ছয় দফা মানতে হবে বাসের কন্টাকটার আমাদের সাথে শ্লোগান দিচ্ছে। কিসের ভাড়া। সবাই হুরহুর করে নেমে পড়তাম আর জনসভায় যোগদান করতাম। কোথায় চলে গেল সেই সোনালী দিনগুলো।

খবরটি অন্যদের সাথে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved dainikshokalerchattogram.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com