মঙ্গলবার, ২৭ জুলাই ২০২১, ০২:৪১ পূর্বাহ্ন

ওসি বিসিএস ক্যাডার হলে কি দুর্নীতি কমবে?

সিরাজ উদ্দিন

পুলিশের দুর্নীতি নিয়ে আলোচনা অনেক দিনের। দুর্নীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের যে দপ্তরগুলো সম্পর্কে অহরহ কথাবার্তা হয়, পুলিশ এদের মধ্যে একটি। পুলিশের কাজকর্মের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে থানা। আর এই থানা নিয়েই নানা রকম কথা, হরেক অভিযোগ নানা মহলের। থানার প্রধান কর্তা ওসি সাহেব। বাংলায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। বাংলা পদবিটা কেউ বলেন না, বলেন ইংরেজি সংক্ষিপ্ত পদবি ওসি। সেই ব্রিটিশ আমল থেকে আজ অবধি।

একসময় ওসি সাহেবের পরিচয় ছিল বড় দারোগা হিসেবে। তাঁর অধীনে থাকতেন মেজ দারোগা, ছোট দারোগা। দারোগা সাহেব কিংবা দারোগা বাবু মাথায় সাদা সাহেবদের মতো হ্যাট পরতেন। পোশাক ছিল খাকি রঙের। কালের পরিবর্তনে পোশাক বদলেছে, সাহেবি হ্যাটের পরিবর্তে সুদৃশ্য টুপি মাথায় উঠেছে। কিন্তু ঘুষ-দুর্নীতির পুরোনো প্রশ্ন পিছু ছাড়েনি কখনো, বরং নীতি-নৈতিকতার মানের অধঃপতনের কথা সামনে এসেছে।

দুর্নীতি দমন কমিশন বিষয়টিকে সম্প্রতি সামনে এনেছে এর সাম্প্রতিক এক প্রস্তাবের মাধ্যমে। প্রথম আলোসহ বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের সুবাদে তা সবার দৃষ্টিগোচর হয়েছে। রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করা ওই প্রস্তাবে দুদক বলেছে, থানার ওসি পদকে আপগ্রেড করে ক্যাডার পদ থেকে নিয়োগ দিতে। বিসিএস পুলিশের নিম্নতম পদ হচ্ছে সহকারী পুলিশ সুপার, সংক্ষেপে এএসপি/সহকারী পুলিশ কমিশনার, সংক্ষেপে এসিপি। এটা এই ক্যাডারের এন্ট্রি পদ।

দুদকের পেশ করা সুপারিশ গৃহীত হলে থানার ওসি পদে নিয়োগ পাবেন ক্যাডারে নিয়োগপ্রাপ্ত এএসপি/এসিপিরা। নন-ক্যাডার দারোগারা কিংবা তাঁদের থেকে পদোন্নতি পাওয়া এএসপি বা এসিপিরাও এই পদে নিয়োগ অযোগ্য হবেন। প্রস্তাবটির মর্মবাণী হচ্ছে, বর্তমান ব্যবস্থায় নিচে থেকে পদোন্নতি পেয়ে এসে ওই পদে বসা দারোগা সাহেবদের দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ক্যাডার পদে যোগ দেওয়া তরুণেরা হবেন প্রতিষেধক।

এই প্রস্তাবটি দেখার পর ১৯৮০-এর দশকের এমনতরো আরেকটি যুক্তির কথা আমার মনে পড়ে গেল। আমি তখন যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন করছি। সে সময় বিদেশ থেকে চাকরি শেষে দেশে ফিরে এলেন সিএসপি এম মোকাম্মেল হক। তখনো তাঁর পদায়ন হয়নি। তিনি তাঁর ব্যাচমেট যোগাযোগ সচিব নাসিম উদ্দিন আহমেদের অফিসে এসে সময় কাটান। সেই সূত্রে আমরা তাঁর নানা চিন্তাভাবনার কথা জানতে পারি। প্রশাসনযন্ত্রে সংস্কার নিয়ে তাঁর ভাবনার কথা বলে নাসিম উদ্দিন সাহেবের সঙ্গে আলোচনায় মাতেন। পাশে থেকে আমি শুনি। তরুণ অফিসার হিসেবে পুলকিত হই। তাঁর এমন সব সংস্কার চিন্তার একটি হচ্ছে ভূমি প্রশাসনে দুর্নীতি রোধে তহশিলদারদের দৌরাত্ম্যে লাগাম টানা।

এম মোকাম্মেল হক কিছুদিনের মধ্যেই ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিব পদে নিয়োজিত হন। তিনি তৎকালীন সরকারপ্রধানকে বোঝাতে সক্ষম হন, তহশিলদারের মাথার ওপর বিসিএসে যোগ দেওয়া তরুণ অফিসারের নিয়োগ দুর্নীতি রোধ ও জনভোগান্তি দূর করবে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য বেরিয়ে এসে বিসিএসে নিয়োগ পাওয়া তরুণেরা দুর্নীতিবিরোধী ভূমিকা নেবেন এবং জনবান্ধব হবেন। তাঁর ওই প্রস্তাব গৃহীত হলো এবং উপজেলায় সহকারী কমিশনারের (ভূমি) পদ সৃষ্টি হলো। সংক্ষেপে যা এসি ল্যান্ড।
প্রায় আড়াই দশক পর আজকে ওই পদক্ষেপের সফলতা ও ব্যর্থতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে ভালোর চেয়ে মন্দ ফল বয়ে এনেছে তা।

মোকাম্মেল সাহেবের চিন্তায় অবশ্যই মহৎ ভাবনা ছিল। ভালো কিছু করার, দুর্নীতি ও হয়রানি থেকে মুক্ত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা ছিল। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। উপরন্তু, বিসিএস প্রশাসন সার্ভিসের স্থায়ী ক্ষতির কারণ তৈরি করেছে। প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দেওয়া নবীন অফিসারদের অনেকেই ওই পদে দায়িত্বে নিয়োজিত হয়ে চাকরির শুরুতেই দুর্নীতির দীক্ষা পেয়েছেন। এখনো পাচ্ছেন। কথিত আছে, তহশিলদারদের কাছেই সেই দীক্ষা তাঁরা পেয়ে থাকেন। আর তা সমগ্র চাকরি জীবনের অভ্যাস হয়ে দাঁড়ায়। নবীন কর্মকর্তাদের এমন সংক্রমণের ভয়াবহতা উপলব্ধি করে কয়েক বছর আগে সরকার এসি ল্যান্ড পদ বিলুপ্তির উদ্যোগ নেয়। কিন্তু নবীন কর্মকর্তাদের প্রতিরোধের মুখে তা ভেস্তে যায়। গত মাসে জনপ্রশাসন সচিব এসি ল্যান্ডদের দুর্নীতিগ্রস্ততার বিষয়ে অসহায়ের মতো ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু তাতে অবস্থার কোনো হেরফের হয়নি।

রাষ্ট্রের দুর্নীতিগ্রস্ত কোনো একটি সার্ভিসে কেবল পদবির নাম পরিবর্তন কিংবা অধস্তনের জায়গায় ঊর্ধ্বতন সোপানের কর্মকর্তার নিয়োগে অবস্থার খুব একটা হেরফের হবে না। পদ সোপান উন্নীত করেও হবে না।
প্রশাসন সার্ভিসের এই দৃষ্টান্ত কি দুদকের বিবেচনায় আছে? দুদক নিশ্চয়ই এই অবস্থা সম্পর্কে অবহিত আছে। তবে এসি ল্যান্ড পদে দুর্নীতিগ্রস্ত ও দুর্নীতি মনস্কতা প্রতিরোধে তাঁরা কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন বলে দেখা যায় না। ওই পদে কাজ করে চাকরি শুরুর চার-পাঁচ বছরের মধ্যে বিশাল বিত্তবৈভবের মালিক হওয়ার কোনো একটি ঘটনায় কি দুদক কোনো পদক্ষেপ নিয়েছে? না, তেমনটা দেখা যায়নি। শুধু এসি ল্যান্ড পদে নয়, ওসিদের দুর্নীতির ক্ষেত্রেও দেখা যায়নি।

প্রশাসনে চাকরি করার অভিজ্ঞতা ও এ নিয়ে আমার পর্যবেক্ষণের আলোকে এ কথা নির্দ্বিধায় বলতে পারি, রাষ্ট্রের দুর্নীতিগ্রস্ত কোনো একটি সার্ভিসে কেবল পদবির নাম পরিবর্তন কিংবা অধস্তনের জায়গায় ঊর্ধ্বতন সোপানের কর্মকর্তার নিয়োগে অবস্থার খুব একটা হেরফের হবে না। পদ সোপান উন্নীত করেও হবে না। তা যদি হতো, তাহলে মন্ত্রণালয়গুলোতে স্টেনোগ্রাফার ও করণিক পদগুলোকে অফিসার পদে উন্নীতকরণ, অতিরিক্তসংখ্যক পদোন্নতির কারণে সহকারী সচিবের পদে যুগ্ম সচিব এবং উপসচিবের পদে অতিরিক্ত সচিবদের পদায়নের ফলে অবস্থার দারুণ রূপান্তর লক্ষ করা যেত। কিন্তু তা ঘটেনি। বরং পতন ঘটেছে।

বিসিএস নিয়ে যে এত আশা-ভরসা ও গৌরব আমাদের তাতে কী অবস্থা? যাঁরা খবর রাখেন, তাঁরা ভেতরের চিত্রটা ভালো করেই জানেন। আরও ভালো জানেন এর বাছাই ও সুপারিশকারী পাবলিক সার্ভিস কমিশনের কর্তাব্যক্তিরা। মেধাবী প্রার্থীরা কেন পুলিশ সার্ভিসকে পছন্দের প্রথমে রাখছেন, তা তো তাঁরা বুঝতে পারছেন। মৌখিক পরীক্ষায় প্রশ্ন করেও বুঝতে চেয়েছেন। প্রকৌশলী, ডাক্তাররাও পুলিশে যাচ্ছেন। কেন যাচ্ছেন, তা অবোধগম্য নয়। অনেকটাই খোলামেলা। অতএব ওসি পদে তাঁরা রূপান্তর ঘটাবেন তা অনেকটাই দুরাশা।

দুর্নীতি মনস্কতা ও দুর্নীতিগ্রস্ত একটি ভাইরাস। ভয়ানক সংক্রমণ ব্যাধি। এর নিরোধে দরকার সামগ্রিক পদক্ষেপ। আগা থেকে গোড়া পর্যন্ত। শুরুটা হতে হবে আগা থেকে। মাথা থেকে। দুর্নীতির বিপক্ষে সরকার ঘোষিত ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিকে দৃষ্টিগ্রাহ্য করার মতো করে।

ওসি বা এসি ল্যান্ড পদের সবাই দুর্নীতিপরায়ণ নয়। ভালো, সৎ মানুষেরাও আছেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে তাঁরা টিকে থাকতে পারছেন না। বিদ্যমান সিস্টেমে সৎ ও ভালো মানুষদের কদর নেই, বরং বিপরীতটাই সত্য। থানার ওসিদের পদায়ন নিয়ে নানা রকম কথা আছে। এমপি ও রাজনৈতিক নেতাদের সুপারিশে তাঁদের থানায় পদায়ন হয়। তারপর চাকরি বাঁচাতে তাঁদের তাঁবেদারি করতে হয়। ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করতে হয়। উপরস্থ ক্যাডার কর্মকর্তারা হন অসহায়, নয়তো নীতিবিহীন দলবাজি ও দুর্নীতি-বাণিজ্যে লিপ্ত। এমন নিদারুণ বাস্তবতায় সার্বিক সিস্টেমিক সংস্কারের বিকল্প আছে বলে মনে হয় না। তেমন বিষয়েই নীতিনির্ধারকদের ভাবা উচিত। যত দ্রুত হয় তা, ততই মঙ্গল।

সিরাজ উদ্দিন সাবেক বিসিএস কর্মকর্তা, গবেষক ও বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র গ্রন্থের লেখক।

খবরটি অন্যদের সাথে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved dainikshokalerchattogram.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com