মঙ্গলবার, ২৭ জুলাই ২০২১, ০১:৩৫ পূর্বাহ্ন

নতুন মেয়র এবংআমার দলিত-মথিত শব্দগুলো

ভারতের অহিংস আন্দোলনের নেতা মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন ‘ Chittagong to the fore’ – চট্টগ্রাম সবার আগে। আরেক জায়গায় তিনি বলেছেন, ‘What Chittagong thinks today, the rest of whole Bangladesh thinks tomorrow-চট্টগ্রাম আজ যা ভাবে, বাকি পুরো বাংলাদেশ তা ভাবে কাল।ভারতের জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধী যে জায়গায় দাঁড়িয়ে চট্টগ্রামের মর্ম-গুরুত্ব উপলব্ধি করেছিলেন, সে জায়গাগুলো আসলে কী? আমরা চট্টগ্রামের মানুষও অনেকেই জানি না। কিংবা জানলেও ভাবতে চাই না। বধির, অন্ধ, বোবা হয়ে থাকি ‘রাজনীতি’র অন্ধ চোরাগলির বাসিন্দা বলে। ফরাসি বিপ্লব এনেছিল বিশ্বমানবের মুক্তির বার্তা। কিন্তু দুনিয়া পাল্টে দেওয়া সে বিপ্লবে অংশ নিয়েছিল এই চট্টগ্রামেরই এক ছেলে।১৭৭৩ সাল। চট্টগ্রাম উপকূলে হানা দিচ্ছে ইংরেজ দাস-ব্যবসায়ীরা। একটি দলের হাতে ধরা পড়ল ১১ বছরের জমির। জাহাজে তাকে পাচার করা হলো মাদাগাস্কারে। সেখান থেকে ফ্রান্স। চট্টগ্রামের এ বালকটিকে কিনে নিলেন ফরাসি সম্রাট পঞ্চদশ লুই। কয়েক জোড়া পশুপাখিসহ তাকে তুলে দিলেন প্রিয় রক্ষিতা কাউন্টেস দ্যু বারির (১৭৪৩-১৭৯৩) হাতে।মাদাম বারি জামরকে ভেবেছিলেন আফ্রিকান। কৃষ্ণকায় এ বালকটিকে তিনি পুত্রস্নেহ দিয়েছিলেন। খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষা দিয়ে সম্রাটের উপাধি যুক্ত করে নাম রেখেছিলেন লুই-বেনোয়া জামর। দিয়েছিলেন শিক্ষা-দীক্ষাও।ধ্রুপদি ফরাসি সাহিত্য ও দর্শন পড়তে পড়তে একদিন তাঁর হাতে এল জাঁ জাক রুশোর বই। প্রবল এক ঝাঁকুনিতে রুশো তাঁকে জাগিয়ে দিলেন। ভেতরে বুনে দিলেন বিদ্রোহের বীজ। গোপনে যোগাযোগ করলেন জ্যাকবপন্থী বিপ্লবীদের সঙ্গে। ১৭৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লব শুরু হলে জামর হলেন কমিটি অব পাবলিক সেফটির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। তারপর সেই এক অনবদ্য ইতিহাস, দুনিয়াকাঁপানো উপাখ্যান- জামর হয়ে ওঠলেন ফরাসি বিপ্লবের নায়ক। বিপ্লবীদের হাতে সম্রাটের পতন ঘটলে প্রাসাদ থেকে বিতাড়িত হলেন মাদাম বারি। ফরাসি অভিজাত শ্রেণীর ওপর তাঁর প্রভাব ছিল গভীর। তিনি বিপ্লবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করলেন। বিপ্লবীরা তাঁকে গ্রেপ্তার করল, কিন্তু ছেড়ে দিতে বাধ্য হলো তথ্যপ্রমাণের অভাবে। ৬ ডিসেম্বর ১৭৯৩ তিনি আবার গ্রেপ্তার হলেন। গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হিসেবে এবার হাজির করা হলো জামরকে।মাদাম বারির কাছে, অন্তত এর আগ পর্যন্ত জামর তাঁর পরিচয় প্রকাশ করেননি। এবার আদালতে দাঁড়িয়ে আত্মপরিচয় দিয়ে বললেন, ‘আমি আফ্রিকার নই, চট্টগ্রামের ছেলে। দাস-ব্যবসায়ীরা আমাকে মাদাগাস্কার নিয়ে যায়। সেখান থেকে ফ্রান্সে।’ভারতের দ্য টেলিগ্রাফ এ অভিজিত গুপ্তের ‘চাইল্ড ফ্রম চিটাগাং’, দ্য হিন্দুতে সরোজা সুন্দরারাজনের ‘ফর লিবার্টি অ্যান্ড ফ্রেটারনিটি’, আনন্দবাজার পত্রিকায় অভিমন্যু সারথির ‘বাঙালি এক বিপ্লবী দাসের কথা’। তথ্য আছে ক্রিস্টোফার এল মিলারের বই দ্য ফ্রেঞ্চ অ্যাটলান্টিক ট্রায়াঙ্গল : লিটারেচার অ্যান্ড কালচার অব স্লেভ ট্রেড এ। জামরের ছবি আছে প্যারিসের বিখ্যাত ল্যুভর জাদুঘরে; ফ্রান্সে আছে তাঁকে নিয়ে বিচিত্র প্রকাশনা। ১৯৩০ সালের যুববিদ্রোহের কথা আমরা সবাই জানি। চাটগাঁর আরেক সন্তান মাস্টারদা সূর্যসেনের নেতৃত্বে ব্রিটিশদের হাত থেকে চট্টগ্রামকে চারদিন স্বাধীন করে রাখার গল্পটিকে বলা হয়, বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনের পথে প্রথম সাহস, প্রথম সৌন্দর্য-শৌর্য। শুধু কি জামর আর সূর্যসেনের বিপ্লবতীর্থ চট্টগ্রাম? না, ঢের আছে এই চট্টগ্রামের। বিশ্বের সমস্ত শক্তি, অর্থবিত্ত একজায়গায় করেও আপনি কি একটা বন্দর বানাতে পারবেন? চাইলেই বন্দর বানানো যায় না। বন্দর প্রকৃতিগতভাবে গড়ে ওঠে। সে দিক দিয়ে আমরা দারুণ সৌভাগ্যবান। আমাদের একটি বিশ্বনন্দিত বন্দর আছে, চট্টগ্রাম বন্দর। এমন একটা বন্দর থাকলে, আর কিছু না থাকলেও চলে। এরপরও বিধাতা আমাদের উজার করে দিয়েছেন। পাহাড়-নদী-সাগর-সমতল-বন-হৃদ- এই ৬টি উপাদান বিশ্বের কোন্ শহরে আপনি খুঁজে পাবেন বলুন তো! তাই চট্টগ্রাম বাংলাদেশের হৃদপিণ্ড। আমাদের প্রাণের শহর, ভালোবাসার শহর। আবেগ-অনুভূতির স্পন্দন। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, বারে বারে আমাদের আবেগ-অনুভূতি নিয়ে খেলা হয়েছে। হয়েছে তামাশা, অপরাজনীতি!মেয়র এসেছেন, মেয়র গেছেন। চট্টগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ে অনেকেই মন্ত্রীগিরী করেছেন, করছেন। কিন্তু চট্টগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া দূরে থাক, চট্টগ্রামকে স্বমহিমায় রাখতে পারেননি, রাখা যায়নি।স্বীকার করি, বৈশ্বিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে চট্টগ্রামের উন্নয়ন হয়েছে। কায়েমি স্বার্থবাদীরা চট্টগ্রামকে পরিকল্পিত নগর হিসেবে গড়ে উঠতে দেয়নি। চট্টগ্রামের সমস্যা সমাধানে পরিকল্পনার ছোঁয়া লাগেনি। যে যার মতো করে উন্নয়ন করেছেন। বিছিন্ন, বিক্ষিপ্ত উন্নয়নের নামে আত্মপ্রচার, আত্মপ্রতিষ্ঠার রাজনীতি করেছেন। ফলে চরম বিশৃঙ্খলতার মধ্যে চট্টগ্রাম শহর আকারে বড় হয়েছে বটে, নান্দনিকতায় বড় হয়নি। বরং চট্টগ্রাম তার অনন্য প্রাকৃতিক সম্পদ হারিয়ে হয়েছে রুগ্ন, হতশ্রী, বিবর্ণ। এমন এক করুণ বাস্তবতার পেছনে বরাবরই কাজ করেছে অপরাজনীতি, অপকৌশল। সব রাজনীতিবিদ, জনপ্রতিনিধিই চট্টগ্রামের উত্থান-পতন, সমস্যা-সঙ্কট, ইতিহাস-ঐতিহ্য, শৌর্য-বির্যের কথা জানেন। কিন্তু বেশিরভাগ রাজনীতিবিদ, জনপ্রতিনিধি মনে করে থাকেন চট্টগ্রামের সমস্যা সমাধান হয়ে গেলে, চট্টগ্রাম তার আপন মহিমায় ফিরে গেলে বোধহয় তাদেরই সমূহক্ষতি। কারণ ‘চট্টগ্রাম’ হচ্ছে রাজনীতির বড় হাতিয়ার, বড় মওকা। এই মওকা জিঁইয়ে রাখতে স্বচ্ছন্দ্যবোধ করেন। আর ‘চট্টগ্রাম ইস্যু’ নানা কৌশলে, অজুহাতে জিঁইয়ে রেখে প্রকারান্তরে তারা রাজনীতির নামে নিজেদের গুছিয়ে নেন, আত্মপ্রতিষ্ঠার উদগ্র পথ খুঁজেন।কেউ বলেন, সিটি করপোরেশনের কর্তৃত্ব নেই। কেউ দোষারোপ করেন সমন্বয়হীনতাকে। কেউ বা চান ‘সিটি গভর্নমেন্ট’। আরে বাবা, আপনার চিন্তা যদি হয় কেবল চট্টগ্রাম, এই জনপদই যদি হয় আপনার ধ্যান-জ্ঞান- তাহলে বাধাগুলো উপড়ে ফেলেন না কেন? সিটি গভর্নমেন্ট হয়ে গেলে, নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব পাওয়ার পর আপনি যদি ব্যর্থ হন-ভয় কি তবে সেখানেই? বিচিত্র শহর চট্টগ্রামকে এগিয়ে নিতে হলে সাহস আর সদিচ্ছার মেলবন্ধন খুব দরকার। চট্টগ্রামের নেতৃত্বে, দায়িত্বে তুখোড়-তুমুল সাহসী মানুষও আমরা পেয়েছি। কিন্তু সেই সাহসের সাথে সদিচ্ছার বিষয়টি ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। ওই যে বললাম, সদিচ্ছাকে কাজে না লাগানোর বিষয় হতে পারে কায়েমি স্বার্থবাদিতা অথবা ‘চট্টগ্রামের উন্নয়ন’ নামক রাজনীতি-অপরাজনীতির মওকা। এমন এক কঠিন বাস্তবতায় নৌকার টিকিট নিয়ে মেয়র হলেন এম রেজাউল করিম চৌধুরী। আওয়ামী লীগে এখনো কিছুটা হলেও তৃণমূলের ত্যাগকে মূল্যায়ন করা হয়, যা নিঃসন্দেহে ভালো দিক, প্রকৃত রাজনৈতিক কর্মীদের জন্য এই দৃষ্টান্ত আশাজাগানিয়া। সেই ধারাবাহিকতায় রেজাউল করিমকে মনোনয়ন দিয়ে মেয়র করলেন প্রধানমন্ত্রী। মনোনয়ন পাবার পর বোদ্ধাজনদের কেউ কেউ বলেছিলেন, রেজাউল করিম যোগ্য বটে, কিন্তু অতীত মেয়রদের চেয়ে কি খুব বেশি সক্ষম? ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন করার বহু পদ, যোগ-উপযোগ আছে। কিন্তু সার্বিক বিবেচনায় চট্টগ্রামের মেয়র তো সুবিশাল পদ! এই পদের সাথে চট্টগ্রামের ৭০ লক্ষ মানুষের আবেগ জড়িত, এই পদ ভালোবাসায় মোড়ানো। চট্টগ্রামের চিরায়ত শৌর্য-সৌন্দর্যের মান রক্ষা করে চট্টগ্রামবাসীর আশা-আকাক্সক্ষা, ভালোবাসার প্রতীক হয়ে ওঠা একজন রেজাউল করিমের পক্ষে কতটা সম্ভব? তিনি কি পারবেন চট্টগ্রামের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করতে?আমি মনে করি চট্টগ্রামের জন্য জীবনবাজি রাখার যোগ্যতা যার আছে, তিনিই কেবল এই নগরের মেয়র হওয়ার যোগ্যতা রাখেন, আর কেউ নন।

খবরটি অন্যদের সাথে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved dainikshokalerchattogram.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com