মঙ্গলবার, ২৭ জুলাই ২০২১, ০১:৫৪ পূর্বাহ্ন

আসাদের মৃত্যুতেই ‘৬৯ এর গণ আন্দোলন গণঅভ্যূত্থানে রূপ নেয়


অধ্যাপক জসিম উদ্দিন চৌধুরী-
আসাদ ১৯৬৯ এর শহীদ ছাত্রনেতা। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্র ছিলেন। ১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি ছাত্র সংগ্রাম কমিটির ১১ দফা আদায়ের মিছিলে পুলিশের গুলিতে তিনি নিহত হন । আসাদের মৃত্যু ‘৬৯এর ছাত্র-গণআন্দোলনের গোটা অবয়বকেই পাল্টে দেয় এবং তা আইয়ুব খানের নিপীড়ন মূলক শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানে পরিণত কর।
তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন গ্রুপ)-এর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রধান সংগঠক। ১৭ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলার সমাবেশে ছাত্র-জনতার ওপর পুলিশ ও ই.পি.আর বাহিনীর হামলা নির্যাতন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পবিত্রতা লঙ্ঘনের প্রতিবাদে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম কমিটি ২০ জানুয়ারি গোটা পূর্ব পাকিস্তানের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পূর্ণ ধর্মঘট পালনের আহবান জানিয়েছিল। সেই ধর্মঘট মোকাবিলার জন্য সরকার ১৪৪ ধারা জারী করে। তথাপি বিভিন্ন কলেজের ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে সমবেত হয় এবং বেলা ১২টার দিকে বটতলায় এক সংক্ষিপ্ত সভা শেষে প্রায় দশহাজার ছাত্রের একটি বিশাল মিছিল ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে মিছিলটি চাঁনখা’র পুলের নিকটে তখনকার পোস্ট গ্রাজুয়েট মেডিক্যাল কলেজের কাছাকাছি এলে এর ওপর পুলিশ হামলা চালায়।
পুলিশ ও ছাত্রজনতার সংঘর্ষ চলার পর আসাদসহ কয়েকজন ছাত্রনেতা মিছিলটিকে ঢাকা হলের পাশ দিয়ে শহরের কেন্দ্রস্থলের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে একজন পুলিশ কর্মকর্তা খুব কাছ থেকে রিভলবারের গুলি ছুঁড়ে আসাদকে হত্যা করে।
সেই খবর শুনে হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী মেডিক্যাল কলেজের দিকে ছুটে আসে। বিকেল ৩টায় কোনো রকম প্রস্ত্ততি ছাড়াই স্বতঃস্ফূর্তভাবে একটি বিরাট শোক মিছিল বের হয়। মেয়েদের নেতৃত্বে এ মিছিল অগ্রসর হতে থাকলে সাধারণ জনগণও এতে যোগ দেয়। আসাদের মুত্যুর প্রতিক্রিয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে বের হওয়া প্রায় দুমাইল দীর্ঘ মিছিলটি শহরের বিভিন্ন রাস্তা প্রদক্ষিণ করে শহীদ মিনারে এসে শেষ হয।
কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম কমিটি আসাদের মৃত্যুতে গোটা পূর্ব পাকিস্তানে ৩ দিনব্যাপী শোক ঘোষণা করে। এ ছাড়া কমিটি ঢাকা শহরে হরতাল এবং পরবর্তী চার দিন প্রতিবাদ মিছিলসহ নানা কর্মসূচি পালন করে। ২৪ তারিখে হরতালে গুলি চললে ঢাকার পরিস্থিতি গভর্নর মোনেম খানের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। সরকারের দমন নীতি জনতাকে দাবিয়ে রাখতে পারে নি এবং শেষাবধি প্রেসিডেন্ট আইয়ুবের পতন ঘটে।
আসাদের মৃত্যুতেই ঊনসত্তরের গণআন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। ছাত্র জনতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে আইয়ুবের নামফলক নামিয়ে আসাদের নাম উৎকীর্ণ করে। এভাবে ‘আইয়ুব গেট’ হয়ে যায় ‘আসাদ গেট’, ‘আইয়ুব এভিনিউ’ নামান্তরিত হয়ে হয় ‘আসাদ এভিনিউ’। তখন থেকে আসাদের নাম হয়ে ওঠে নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রামের মূর্ত প্রতীক।
একজন ছাত্রনেতা হয়েও পাশাপাশি শক্তি শালী কৃষক সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন। আসাদ ‘জনগণতন্ত্র’কে মনে করতেন মুক্তির মন্ত্র। আসাদ নিপীড়িত অসহায় মানুষদের পক্ষে কাজ করার জন্য তিনি কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ব বাংলার সমন্বয় কমিটির একজন সদস্য হিসেবেও কাজ করতেন।
তিনি মাওলানা ভাসানীর আদর্শের অনুসারী ছিলেন।তিনি তৎকালীন কিংবদন্তী ছাত্র, শ্রমিক নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফরের নেতৃত্বে নির্যাতিত ও নিপীড়িত মানুষের জন্য কাজ করতেন।

খবরটি অন্যদের সাথে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved dainikshokalerchattogram.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com