বুধবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০২১, ০৯:৫৫ অপরাহ্ন

শিরোনাম
সিএন্ডএফ এজেন্টস নির্বাচনে সম্মিলিত-সমমনা ঐক্যজোটের আত্বপ্রকাশ ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন উদযাপন উপলক্ষ্যে চসিকের “ওরিয়েন্টশন ও পরিকল্পনা সভা” চিকিৎসার সুযোগ না দিয়ে বেগম খালেদা জিয়াকে হত্যার ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে এত আঘাতের পরেও খালেদাকে সুযোগ দিয়েছি: প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্র নৌবাহিনীর জাহাজ ‘তুলসা’ ভিড়লো চট্টগ্রাম বন্দরে আবরার হত্যা: ২০ জনের ফাঁসি, ৫ জনের যাবজ্জীবন প্রতিবন্ধীদের জীবনমান উন্নয়নে সরকারের পাশাপাশি সবাইকে উদ্যোগী হতে হবে নগরীতে ভূমিকম্প সহনীয় আবাসন নির্মাণ করার আহবান মেয়রের নগরীতে এবার ড্রেনে পড়ে নিখোঁজ ১০ বছরের শিশু একজনের ৫টির বেশি সিম নয়: সংসদীয় কমিটি

হুমকিদাতাই প্রধানমন্ত্রীর সামনে: গণমাধ্যমে নেতৃত্বের দায়

রিয়াজ হায়দার চৌধুরী

বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের অনুদানের চেক হস্তান্তর অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত গোছানো এবং সুন্দর ভাবেই সমাপন হয়। খুব দ্রুততম সময়ের মধ্যে তথ্য মন্ত্রণালয় ও অধিভুক্ত সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের দায়িত্বশীলরা এমন মর্যাদাপূর্ণ অনুষ্ঠানটির আয়োজন করেন। কিন্তু এক মগ দুধে এক চিমটি লেবু মিশিয়ে দেয়ার মতই হল জাতির পিতার কন্যা ও প্রধানমন্ত্রীকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হুমকি দেওয়া জামাত-শিবিরের ডোনার-ক্যাডার কথিত সাংবাদিক সাদাত উল্লাহ’র খোদ প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকেই চেক গ্রহণের ঘটনা!

গণমাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের নেতৃত্ব ও সাংবাদিক- জনতার কাছে ঘটনাটি অপমান -অমর্যাদার গ্লানি, নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কা ও বিশ্বাসহীনতার লজ্জায় মাটিতে লুটিয়ে পড়ার মতো।

আর প্রধানমন্ত্রী যেভাবে সর্বত্র দুর্নীতিবিরোধী অভিযান ও অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার পদক্ষেপ নিয়ে চলেছেন, সেখানে এমন ঘটনা বিশেষভাবে বিশ্লেষণের দাবিতো রাখেই।

জামাত-শিবিরের নানা কার্যক্রমে সম্পৃক্ত এই কথিত সাংবাদিক ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান সাদাত জনধিকৃত যুদ্ধাপরাধী সাঈদীর মুক্তি দাবিতে স্ট্যাটাস দেন। অনেক জামায়াত নেতার সাথে তার ছবিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসেছে।

প্রশ্ন উঠেছে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত চেক বিতরণ অনুষ্ঠানে এমন জামাত-শিবিরের অনুপ্রবেশ ঘটল কিভাবে? এতে সাংবাদিকদের জাতীয় নেতৃত্বের দায়বদ্ধতা ও দায়িত্বশীল অন্যদের দিকে অভিযোগের আঙুল তুলেছেন কেউ কেউ । আবার কেউ কেউ বিভিন্ন অঙ্গ ইউনিয়নের নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন কেন্দ্রিক ফায়দা নিতে অযোক্তিক কথার ফল্গুধারাও ছড়িয়েছেন।

এ নিয়ে কথা হয় বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্ট এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক(এমডি) ও ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নে আমার পূর্ববর্তী সহ-সভাপতি জাফর ওয়াজেদের সাথে । তিনি সাফ জানালেন, অভিযুক্ত সাদাতের আবেদনটি মঞ্জুর হয় তাঁর নিয়োগের আগেই। তাছাড়া উত্থাপিত অভিযোগ নিয়ে তিনি তদন্ত করবেন বলেও জানান। অবশ্য ট্রাস্ট এম ডি, কবি জাফর ওয়াজেদের কাছ থেকে জামায়াত ঘরানার লোকজন নিরাপদ দুরত্বেই থাকার কথা। কেননা, সাংবাদিকতার সুবর্ণকালে তিনি ছিলেন জামায়াত শিবিরের আতংক। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম কলেজসহ চট্টগ্রামে শিবিরের রাজত্বের বিরুদ্ধে তাঁর সাহসী লেখনী চট্টগ্রামের পাঠককুলকে যেন এখনো পল্লবিত করে।

এখন তাই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, কল্যাণ ট্রাস্টের নিযুক্ত সাংবাদিক প্রতিনিধিরা কি করেছেন? তারা কি বিষয়টি দেখেননি? যাচাই করেননি?!

সেদিন যা ঘটেছিল: প্রধানমন্ত্রীর হাত দিয়ে সাংবাদিকদের অর্থ সহায়তা প্রদান অনুষ্ঠানের প্রায় সব কটিতেই উপস্থিত থাকার সৌভাগ্য আমার হয়েছে । বঙ্গবন্ধু কন্যার হাত থেকে এ যাবৎ সর্বোচ্চ সংখ্যক চেক সহকর্মীদের জন্য গ্রহণ করার সৌভাগ্যবান মানুষটিও আমি। এবার কিছু বিষয়ে আমি চমক পেলাম । বিস্মিতও হলাম।

অনুষ্ঠানটিতে সমসাময়িক ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের গভীরতা রাষ্ট্র, রাজনীতি ও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ নিয়ে ভাবনার অবকাশ রাখে। গণমাধ্যমের দায়বদ্ধতার বিষয়ে প্রকট তাগাদা অনুভূত হয়।

অনুষ্ঠানস্থলে চমকে ওঠার মতো ছিল চট্টগ্রামের কৃতী সন্তান তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের অন্বেষণ । হল রুমে ঢুকেই তিনি নাম ধরেই চট্টগ্রামের নেতৃত্বকে খুঁজছিলেন । এ সময় ফেডারেশন সভাপতি মোল্লা জালাল ও মহাসচিব শাবান মাহমুদ পাশ থেকে প্রায় সমস্বরেই আমার নাম ধরেই ডাকতে থাকলেন । চট্টগ্রামের মানুষের প্রতি তথ্য মন্ত্রীর এমন টান উপস্থিত অনেকেরই নজর কাড়ে।আমি নিজেও ব্যক্তিগতভাবে আপ্লুত।

এর একটু আগেই হলরুমটাতে ঢুকে সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুও প্রথম সারিতে বসা সবার সাথে একে একে হাত মেলাচ্ছিলেন। আমাদের সামনে দিয়ে যেতেই আমি সালাম দিলাম। ভেবেছিলাম হয়তো সাবেক মন্ত্রী ভুলেই গেছেন আমাকে। কিন্তু হাত বাড়াতেই অনেকটা অবাক করে দিয়ে বললেন,” কি খবর, কেমন আছে চট্টগ্রাম ?”

এভাবে আমাদের একে অন্যের সাথে কুশল বিনিময়ের পর্ব শেষ হতেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী হলরুমে ঢুকেন। যথারীতি তাঁর বক্তব্যের আমরা মুগ্ধ শ্রোতা। বক্তব্যের ঠিক শেষ লগ্নে এসে তিনি দিলেন একটি শোক সংবাদ।

আমাদের চট্টগ্রামের মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সদস্য, জাসদ কার্যকরী সভাপতি মাঈনুদ্দিন খান বাদল এর মৃত্যুর খবর হল রুমটিতে ভরা মজলিসে সবার আগেই সাংবাদিকদের জানালেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। মুহূর্তে হল জূড়ে শোক স্তব্ধতা। আর এর মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রীও শেষ করলেন তাঁর বক্তব্য।

সব ছাপিয়ে আমরা যখন অত্যন্ত কম সময়ে একটি অনুষ্ঠানের সাফল্য ও প্রধানমন্ত্রীর ভাষ্যে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে ফিরছিলাম, তখন আমাদের মন বিদ্ধ করছিল তখনো অনেকের চোখের আড়ালে থাকা একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ! কিছুক্ষণ পরেই দেখি তা নিয়ে আওয়াজ শুরু হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

দায়িত্বশীলদের অপরিণামদর্শিতার কারণেই ঘটে গেল কালিমালিপ্ত ঘটনাটি। এই প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রীকে হুমকি দেওয়া কোন জামাতী ক্যাডার সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের চেক সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকেই গ্রহণ করলেন ! এবং সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার মুখে সেই চেকটির কার্যকারিতাও ২৪ ঘণ্টা না যেতেই বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়া হলো।

কল্যাণ ট্রাস্টে কি বিরোধীপক্ষ নিষিদ্ধ? প্রশ্ন উঠেছে, জামাত-শিবিরের ডোনার কিংবা নেতা কিভাবে প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে চেক নিবেন?- এই প্রশ্নের বিপরীতে দলীয় বিভক্তির ঊর্ধ্বে উঠে ভাবলে এই প্রশ্নও এসে যায় যে, “তবে কি কল্যাণ ট্রাস্টের অর্থ সহায়তার ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিরোধীপক্ষ নিষিদ্ধ?”

এরকম পরস্পরবিরোধী প্রশ্নের উত্তর খোঁজা যাক প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যেই। প্রধানমন্ত্রীর স্পষ্ট ভাষ্য, সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্ট দলীয় বিবেচনায় ব্যবহৃত হচ্ছে না । বিএনপিসহ অন্য যে কোন দলের সমর্থক সাংবাদিকরাও এর সুবিধাভোগী। উল্টো বঙ্গবন্ধুকন্যা কেন এমন একটি ট্রাস্ট থেকে সহযোগিতা করছেন বা তাঁর নিজের তহবিল থেকে এভাবে অর্থ সহায়তা দেন কেন, তা নিয়ে একটি মহলের নানা প্রশ্ন ও একজন স্বনামধন্য আইনজ্ঞের নোটিশের আবির্ভাবের কথাও প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে তুলে ধরেছেন।

সাংবাদিক কল্যাণ তহবিল কিংবা কল্যাণ ট্রাস্টে আওয়ামী লীগ ঘরানার সাংবাদিকদের বাইরেও বিএনপিসহ অন্য প্রায় সব দলের অনুসারী সাংবাদিকরাও ইতোপূর্বে সহযোগিতা পেয়েছেন । খোদ প্রধানমন্ত্রীর উদার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ট্রাস্টের সুযোগ দল-মত নির্বিশেষে সবার জন্য অবারিত রাখা হয়। তাহলে এই শাহাদাত উল্লাহকে নিয়ে কেন এতো বিতর্ক ?

জামায়াত-শিবির ক্যাডার শাহাদাতকে ঘিরে যত অভিযোগ: বিতর্কিত সাংবাদিক সাদাত কেন, কিভাবে, প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে ? এমন প্রশ্নের উত্তর সন্ধানে যে কোন সভ্য বিবেকবান ব্যক্তির অস্বীকার করার কথা নয় যে, জামাত শিবিরের যে ক্যাডার মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়কালের মানবতাবিরোধী অপরাধী হিসেবে আদালতে কর্তৃক দোষী সাব্যস্ত সাঈদীর মুক্তির দাবি জানিয়ে এবং খোদ প্রধানমন্ত্রীকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হুমকি দেয়, সে নিশ্চয়ই রাষ্ট্রীয় কোন ফান্ডের সহযোগিতা পাওয়ার দাবিদার হতে পারে না। শিবির ক্যাডার সাদাত এই কাজটি করেন।

খুব বেশিদিন আগের কথা নয় , শেখ হাসিনা সরকারের সময়েই সাত বছর আগে সাদাত উল্লাহ সামাজিক যোগাযোগ মধ্যমে এমন হুমকি দেয়। সাঈদীর মুক্তির জন্য এই জামাত ক্যাডার বাঁশের লাঠি, তীর ধনুক, বল্লম নিয়ে রাস্তায় নামার আহ্বান জানিয়েছিলন।

২০১২ সালে দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার চরম্বা ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে জামায়াত-শিবিরের সমর্থনে চেয়ারম্যান নির্বাচিত এই সাদাত একসময় বান্দরবান বসবাস করার সুবাদে জামায়াত ঘরানার পত্রিকা দৈনিক কর্ণফুলী ও দৈনিক ইনকিলাব এর প্রতিনিধি হন।

২০১২ সালের ১১ জুলাই জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর ও তৎকালীন সংসদ সদস্য শামসুল ইসলাম কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পেলে সাদাতসহ জামায়াত নেতারা তাকে বরণ করে, সেই ছবিও ফেসবুকে তারা শেয়ার দেয়।

২০১৩ সালের আগস্টে লোহাগাড়ার চরম্বা ইউনিয়নের সাতজন ইউপি সদস্য এই চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে কালোবাজারে ভিজিএফের ৪/৫ কেজি চাল বিক্রির অভিযোগ তোলে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ঘেঁটে দেখা যায়, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী সহ সরকার ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল শীর্ষ ব্যক্তিদের পাশে ঠেলেটুলে ঘনিষ্ঠ ভাবে দাঁড়িয়ে ছবি তুলে তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে নিজের প্রদর্শনীর প্রচেষ্টা চালিয়েছেন এই সাদাত । .

নিজেকে প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিব মেজর জেনারেল জয়নাল আবেদীনের ভাগ্নে পরিচয় দিয়ে একটি অনুষ্ঠানের ঘনিষ্ঠ ছবিও শেয়ার দেন ফেসবুকে। অথচ তাঁর কোন বোনই নেই বলে স্হানীয় নির্ভরযোগ্যরা নিশ্চিত করেছেন ! তবুও উনাকে মামা পরিচয় দেয়া কথিত ভাগ্নেদের এমন প্রতারণায় তাঁর নিকটজনসহ সচেতনদের মাঝেও বেড়েছে উদ্বেগ, অসন্তোষ ।

জামাত শিবির থেকে এসে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বাগিয়ে নেওয়া সাতকানিয়ার সংসদ সদস্য আবু রেজা মুহাম্মদ নেজামুদ্দিন নদভীসহ প্রভাবশালী অনেকের সাথেই তার ঘনিষ্ঠতার ছবিও ফেসবুকে এখনো ভাসছে।

‘নিজেকে আওয়ামী লীগ সম্পৃক্ত প্রমাণ করে প্রশাসনের সুবিধা আদায় ছিল তার লক্ষ্য -‘এমনটিই জানালেন সময় টিভির বান্দরবান প্রতিনিধি এস বাসু দাশ। অনেকের মনে সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের দায়িত্বশীলদের নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়টিও প্রশ্নের অবতারণা ঘটায় বৈকি !

এদিকে দুস্হ সাংবাদিক সেজে শিবির ক্যাডার ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান সাদাতের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গিয়ে ২ লক্ষ টাকার অনুদান গ্রহণের ঘটনায় বিস্মিত ও উদ্বিগ্ন বান্দরবান জেলা আওয়ামী লীগ । তারা এ ঘটনার তদন্তের দাবিও জানিয়েছেন ।সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে চলছে তোলপাড়।

চট্টগ্রামের তরুণ সাংবাদিক প্রীতম দাশসহ চট্টগ্রাম বিভাগের অনেক তরুণ সাংবাদিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আশঙ্কা ব্যক্ত করে বলছেন, ‘প্রশাসনের অভ্যন্তরে ঘাপটি মেরে থাকা জামাত-বিএনপি অগ্নির সন্ত্রাসীদের শেকড় উন্মোচন করা জরুরি, নয় তো অন্ধকারের এই অপশক্তি আবারো দেশকে পাকিস্তানি ধারায় নিয়ে যাবে। দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়তে পারে।’

গণমাধ্যমে যত প্রশ্ন: পেশাদার সংবাদকর্মী হিসেবে অনেকের আছে কিছু অন্য প্রশ্নও । সাংবাদিক সংগঠনের শীর্ষ পর্যায়ে নেতৃত্ব দেয়াসহ প্রায় চারদশক সাংবাদিকতা করেও গেলবারে স্বপন মহাজনের পরিবারের মিলেছে মাত্র ১লক্ষ টাকা। সাংবাদিক সহকর্মী গোলাম শরীফ টিটু সড়ক দুর্ঘটনায় গোটা পা’টা ভেঙে গেল, চারমাস ধরে শয্যাশায়ী। তার জুটেছে মাত্র ৫০হাজার । এদিকে চট্টগ্রামসহ দেশজুড়ে প্রগতিশীল কয়েকটি সাংবাদিক ইউনিয়ন ও প্রেসক্লাবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অনেক পেশাদার সাংবাদিক এখনো সদস্য পদ পাচ্ছেন না শুধুমাত্র দীর্ঘদিন ধরে জামাত-বিএনপি ঘরানার মদদপুষ্ট হয়ে নির্বাচিত নেতৃত্বের একটি সিন্ডিকেটের কারণে।

সরকারে আওয়ামী লীগের দায়িত্বকালেও এই বিপুল সংখ্যক সাংবাদিকের সদস্য পদ না পাওয়া এবং উল্টো জামাত-বিএনপির অনুসারী সাংবাদিকরা শুধু সদস্যপদ নয়, খোদ প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকেই কল্যাণ ট্রাস্টের এভাবে লক্ষ লক্ষ টাকা নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ অসন্তোষ ছড়িয়ে আছে গণমাধ্যমে। প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিকতা সত্বেও দায়িত্বশীল অন্যদের ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’র কারণে এভাবে গণমাধ্যমে অপ্রাপ্তি ও বঞ্চনার তালিকা বেশ দীর্ঘ।

যেখানে ঢাকার বাইরে অনেক দুস্থ, পক্ষাঘাতগ্রস্ত, দুর্ঘটনায় মারাত্মক আহত সাংবাদিকও এখনো পর্যাপ্ত সহযোগিতা পান না, যেখানে অনেক সাংবাদিকের সহায়তার আবেদনপত্র কোনো কোনো নেতা ব্যক্তি আক্রোশ বা গ্রুপ রাজনীতির কারণে কল্যাণ ট্রাস্ট পর্যন্ত পৌঁছাতে দেন না বা আটকে রাখেন, সেখানে এই জামাত-শিবিরের বিতর্কিত সাদাতের কেন ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলো? যেই ব্যক্তিটি জামাতের ডাকা হরতাল সফল করতে সরকার বিরোধী স্ট্যাটাস দেয়, যে ব্যক্তি সরকারকে দেখিয়ে দেওয়ার হুমকি দেয়, সেই ব্যক্তি কিভাবে ‘স্যুটেড-বুটেড’ হয়ে কল্যাণ ট্রাস্টের ২লক্ষ টাকার সহায়তা চেক নিলেন খোদ প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে !?

এর আগে মাত্র এক মাসের মধ্যেই তাকে খোদ প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে আরো ২ লক্ষ টাকা সহায়তা দেয়ার ব্যবস্থা কেন, কিভাবে, কারা করে দিলেন? অনুষ্ঠানটিতে সেই ব্যক্তির কখনো মুখ্যসচিব, কখনো প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব,কখনো উপ-প্রেস সচিবের কাছে ঘেঁষার প্রবণতা প্রত্যক্ষদর্শীদের মনে সন্দেহের উদ্রেক ঘটায় । এতসব প্রশ্ন, সংশয় কিংবা শংকার মাঝে প্রাসঙ্গিকভাবে উঠে আসে এই প্রক্রিয়ায় সাংবাদিক নেতৃত্বের দায়িত্ব -দায়বদ্ধতার বিষয়টি ।

সাংবাদিক নেতৃত্বের দায়িত্ব-দায়বদ্ধতা: বর্তমান বাস্তবতায় একথা অনস্বীকার্য যে, ঢাকার একশ্রেণীর সাংবাদিক নেতা আছেন, যারা সহকর্মীদের অধিকার-মর্যাদা-নিরাপত্তার চেয়ে নিজেদের আত্মকেন্দ্রিকতা ও প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষায় মগ্ন । ফেডারেশন ভুক্ত কোন কোন ইউনিয়নের ঢাকাস্থ নেতারা ঢাকার বাইরের নেতৃত্বকে আমলেই নিতে চান না। অথচ অনুসন্ধান করলে স্পষ্ট হয়ে উঠবে যে, ঢাকার চেয়ে ঢাকার বাইরে সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতৃত্ব অনেক বেশি শক্তিশালী ও কার্যকর । ঢাকার সিংহভাগ নেতা আত্মগরিমা, আত্মপ্রচার ও প্রাপ্তির প্রতিযোগিতার দৌড়ে রয়েছেন।

কল্যাণ ট্রাস্টের অর্থ সহায়তা নিয়ে যে বিতর্ক তার দায় এড়াতে পারেন না কল্যাণ ট্রাস্টে নিযুক্ত সাংবাদিক প্রতিনিধিগণ কেউ’ই । দায় এড়াতে পারবেন না দায়িত্বশীল অন্য কেউও ।

সাধারণত মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে এমন যেকোন অনুষ্ঠানে গমনাগমনের ক্ষেত্রে যে সব অনুসন্ধান শেষে নিরাপত্তা পাস ইস্যু করা হয়, এক্ষেত্রে দায়িত্বশীলরা তাঁদের কাজটুকু কিভাবে কতটুকু করেছেন, তাও বোধগম্য নয়।

কোন সাংবাদিক নেতা কিংবা বান্দরবানের কোন সরকারি কর্মকর্তা এমন কথিত ও বিতর্কিত সাংবাদিককে কল্যাণ ট্রাস্টের অনুদান পেতে মনোনীত করেছেন, তার বিষয়েও খতিয়ে দেখা দরকার।

সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টে জামাত-শিবিরের সাদাত উল্লাহকে অনুদান প্রদানসহ ইতোপূর্বে ঘটে যাওয়া আরো কিছু অনাকাঙ্খিত ‘নয় ছয়’ পরিস্থিতিতে বিস্ময় জাগে, উদ্বিগ্ন হই ।

বাংলাদেশের সাংবাদিকদের সর্বোচ্চ জাতীয় সংগঠন বিএফইউজে-বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সহ-সভাপতি ও চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি হিসেবে আমি মনে করি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পূর্বের একটি ঘোষণা বাস্তবায়ন না হওয়ায় এমন বিব্রতকর পরিস্থিতির সূত্রপাত ।

প্রায় তিন বছর আগে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে জাতীয় প্রেসক্লাবে ইফতার পরবর্তী ক্লোজডোর মিটিংয়ে চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের তৎকালীন সভাপতি হিসেবে আমি সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টে ঢাকার বাইরের বিভাগীয় পর্যায়ের নির্বাচিত নেতাদের প্রতিনিধিত্ব দাবি করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলাম। তিনি (মাননীয় প্রধানমন্ত্রী) সেদিন এ ব্যাপারে তাঁর বক্তব্যে ঘোষণাও দিয়েছিলেন। তাঁর সেই ঘোষণা অনুযায়ী যদি কল্যাণ ট্রাস্টের ঢাকার বাইরের অন্তত চট্টগ্রাম থেকে প্রতিনিধিত্ব থাকতো, তাতে এমন করে আজ বিতর্কের পরিস্থিতি হতো না।

তাছাড়া বিভাগীয় পর্যায়ে থেকে নির্বাচিত নেতা হিসেবে এই ব্যাপারগুলোতে আমাদের মতামত গ্রহণ করলেও আজ এরকম বিতর্কের কোন সুযোগই তৈরি হতো না।

কল্যাণ ট্রাস্টে পাঁচজন সদস্য থাকলে পাঁচজনই ঢাকার। ঢাকার বাইরের কেউ নেই। বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি অনুধাবন করেই ঢাকার বাইরে প্রতিনিধিত্বের বিষয়ে আমার দাবির ব্যাপারে সেদিন সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন । কিন্তু ঢাকার নেতৃত্বের সিন্ডিকেট সেটি হতে দেয়নি।

সাংবাদিকদের কোন কোন নেতা ভোট নিয়ে বিজয়ের পর থেকে সাধারণ সদস্যদের আর পাশে নেই । কোন কোন অঙ্গ ইউনিয়নের নেতাদের মধ্যে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিভক্তি ও কেন্দ্রীয় নেতাদের হার জিতে বিভক্তির দ্বৈরথ অনেক সাধারণ সদস্যের ভাগ্যে কুঠারাঘাত করেছে । বিভক্তির কারণে কোন কোন অঙ্গ ইউনিয়নে সভাপতি সুপারিশ তালিকা দেন সাধারণ সম্পাদক জানেননা । আবার সাধারণ সম্পাদক তালিকা দেন সভাপতিকে না জানিয়ে !

আবার কোন কোন জেলায় প্রেসক্লাব ও সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতৃত্বের মধ্যকার স্নায়ুবিক বিরোধ পরিস্থিতি জটিল করছে। ‌ এসবের সুযোগ নিচ্ছেন কোন কোন জেলার প্রশাসক ও কিংবা তৃতীয় পক্ষ। আবার কোথাও কোথাও প্রেসক্লাব ও ইউনিয়ন নেতৃত্বের বাইরে ক্ষমতাসীন প্রভাবশালী কেউ কেউ সরাসরি নিজেদের অনুগত নিকটাত্মীয়দের নাম সুপারিশ করছেন কল্যাণ ট্রাস্টে‌ কিংবা প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে অনুদানের জন্য।

এমনতর পরিবেশে বিতর্কিত সাদাত কোন পদটি অবলম্বন করলেন তাই খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। সরকারের অংশীজন হয়ে কিংবা অন্য কোনভাবে ক্ষমতাধর কোন “মামা-চাচা”র বলে সাদাত এই পর্যন্ত এলেন, ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের স্বার্থে, তা খতিয়ে দেখা খুব জরুরী।

লাইনচ্যুত ট্রেন: প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ না মানায় এখন লাইনচ্যুত ট্রেনের দশা’ই যেন হয়েছে সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের। অথচ কোন দাবী উচ্চারণের আগেই সাংবাদিকদের নিরবচ্ছিন্ন কল্যাণের স্বার্থে প্রধানমন্ত্রী নিজেই ট্রাস্টটি গঠন করেন। তিনি শুরু করেছিলেন একটি কল্যাণ তহবিল দিয়ে। তাঁর সরকারের অন্য অনেক অর্জনের মত সাংবাদিকদের সহায়তা দেয়ার প্রক্রিয়াও যাতে বিএনপি বা অন্য কোন শক্তি অতীতের মত বন্ধ করতে না পারে, সেই লক্ষ্যেই এই ট্রাস্টটি গঠন করেন বলে প্রধানমন্ত্রী নিজেই জানান।

সমাধান সুত্রঃ

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাঁর সময়কালে শুধু কল্যাণ ট্রাস্ট নয়, গণমাধ্যমকে অনেক কিছুই দিয়েছেন। কথায় কথায় সাংবাদিকদের গ্রেফতারের যে ধারা, সেটি তিনি তুলে দিয়েছিলেন । তথ্য কমিশন , তথ্য অধিকার আইন দিয়েছেন। ট্রাস্টের আওতায় এ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ১৪কোটি টাকা অর্থ সহযোগিতা দিয়েছেন। সাংবাদিকদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা জমা হয়েছে ট্রাস্ট ফান্ডে । সর্বোচ্চসংখ্যক আবাসন নিশ্চিতের প্রচেষ্টাও করেন বঙ্গবন্ধু কন্যার সরকার। বিতর্ক উপেক্ষা না করেও স্বীকার করতেই হয়, দুটি ওয়েজ বোর্ড রোয়েদাদ ঘোষণা করেছেন, যা কিনা কোন গণতান্ত্রিক সরকারের বেলায় অতীতে হয়নি।

সবমিলিয়ে গণমাধ্যমে আমাদের মর্যাদা অধিকার প্রশ্নে নিজেদেরই সর্বোচ্চ সচেতনতা প্রয়োজন। ভবিষ্যতে এমন বিতর্ক থেকে মুক্তি পেতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সেই ঘোষণা বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে সাংবাদিকদের ফেডারেল বডিতে ঢাকার বাইরের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া’ই সমাধান সুত্র।

আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সংবাদপত্রে কাজ করেছিলেন। লিখেছেন, পত্রিকা বিলিও করেছেন ।তাঁর রাজনৈতিক সাফল্যে জড়িয়ে আছে সংবাদপত্রের বিশেষ অবদান। স্বাধীন বাংলাদেশ তিনি বঙ্গবন্ধু একটি বিশেষ পর্যায়ে এসে জাতীয় স্বার্থে সংবাদপত্র শিল্পে সংখ্যাগত সংকোচন আনলেও সব সাংবাদিকের চাকরির গ্যারান্টি দিয়েছিলেন।তাঁর কন্যার দায়িত্বকালীন সময়ে গণমাধ্যম সবচেয়ে বেশি বিকশিত হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করে সাম্য ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করতেই স্বাধীনতার সংগ্রাম ও এই দেশ রাষ্ট্রকে মুক্ত করেছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশের পাঁচ দশক পরে এসেও যদি বঙ্গবন্ধুর সেই আহ্বান কিংবা ডাক বা রাজধানী ঢাকার বাইরের কণ্ঠস্বর দায়িত্বশীলরা শুনতে না পারেন, তবে এ দায় থেকে কারোরই মুক্তি মিলবে না।

আত্মগরিমা, প্রতিহিংসা, বিদ্বেষ ও বিভক্তি বাদ দিয়ে নিজেদের নেতৃত্ব, সরকার ও দায়িত্বশীলদের মাঝে ঘাপটি মেরে থাকা বর্ণচোরাদের চিহ্নিত করে বৃহত্তর ঐক্যের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ আলোকিত করাই এখন লক্ষ্য হওয়া উচিত।

আমাদের অতীতের সব ব্যর্থতা মাড়িয়ে এই লক্ষ্যে নিঃসন্দেহে নতুন তথ্যমন্ত্রী পাশেই থাকবেন- এই আশাটা আমরা করতেই পারি।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিস্ট, পেশাজীবী, নাগরিক সংগঠক/ সহ-সভাপতি, বিএফইউজে-বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন

খবরটি অন্যদের সাথে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved dainikshokalerchattogram.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com