মঙ্গলবার, ৩০ নভেম্বর ২০২১, ০২:৫৮ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম
আনোয়ারা উপজেলায় পিস প্রকল্পের উগ্রবাদ প্রতিহতকরণে নাগরিকদের সচেতনতা বৃদ্ধিকরণ” বিষয়ক প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত পুলিশ কমিশনারের সাথে ডা.শাহাদাত হোসেনের সাক্ষাৎ মৎস্যজীবী লীগের স্বীকৃতি প্রদানের ২য় বর্ষপূর্তির আলোচনা সভা চসিক মেয়রের সাথে সিএমপি কমিশনারের সৌজন্য সাক্ষাত খালেদা জিয়ার অসুস্থতার জন্য বিএনপিই দায়ী ওমিক্রনের কারণে এইচএসসি পরীক্ষা বন্ধ হবে না-দীপু মনি বাংলাদেশ এখন বিনিয়োগ বান্ধব দেশ: আইনমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মেডিক্যাল রিপোর্ট বিদেশে পাঠানো হয়েছে: পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিডিয়া অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্র বিন্দু বিটিভি চট্টগ্রামের ধারাবাহিক ‘জলতরঙ্গ’ চট্টগ্রামে গণপরিবহনে হাফ পাসের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন

সাংবাদিক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া

ইত্তেফাক পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ১৯১১ সালে তত্কালীন বরিশালের ভাণ্ডারিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি নিজ গ্রামের স্কুলে প্রাথমিক ও অষ্টমশ্রেণি পর্যন্ত ভাণ্ডারিয়া হাইস্কুলে অধ্যয়ন করে পিরোজপুর সরকারি স্কুলে ভর্তি হন। ১৯৩১ সালে ম্যাট্রিক পাস করেন। বরিশাল বিএম কলেজে ভর্তি হন। তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। ১৯৩৪ সালে ডিস্টিংশনসহ বিএ পাস করেন। তিনি পিরোজপুর মুন্সেফ আদালতে চাকরি গ্রহণ করেন। তাঁর চাচা অ্যাডভোকেট আফতাবউদ্দিন আহমেদ পিরোজপুর মুসলিম লীগের নেতা এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সহচর ছিলেন। শহীদ সোহরাওয়ার্দী পিরোজপুর শহরে এলে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার সঙ্গে দেখা হয়। তাঁর প্রতিভা দেখে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে বরিশাল জেলার জনসংযোগ অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেন।

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ১৯৪৬ সালে অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তিনি ছিলেন প্রতিভাবান সংগঠক। তাঁর প্রয়োজন ছিল একটি ক্ষুরধার তরবারি— অসি এবং একজন সাহসী লেখক— মসি। তিনি শেখ মুজিবুর রহমানকে খুঁজে পেলেন তাঁর ভবিষ্যতের অসি হিসেবে। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনের প্রাক্কালে তিনি পিরোজপুর এসেছিলেন। তিনি আবিষ্কার করলেন তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে। তাকে তিনি বঙ্গীয় মুসলিম লীগ অফিসের সেক্রেটারি নিযুক্ত করেন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বিশ্বাস করতেন— গণমাধ্যম শক্তিশালী না হলে তিনি রাজনীতিতে সফল হতে পারবেন না, তাই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন ‘দৈনিক ইত্তেহাদ’ পত্রিকা প্রকাশের। সম্পাদক নিযুক্ত করলেন বিশিষ্ট সাংবাদিক আবুল মনসুর আহমদকে এবং পত্রিকার পরিচালনা বিভাগে সেক্রেটারি নিযুক্ত করেন তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে। অল্পদিনের মধ্যে দৈনিক ইত্তেহাদ জনপ্রিয়তা লাভ করে। ১৯৪৭ সালের এপ্রিল মাসে প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী স্বাধীন-অবিভক্ত বাংলা দাবি করেন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর স্বাধীন বাংলার পক্ষে মানিক মিয়া যুক্তিসহ লেখা শুরু করেন। ভারত বিভাগের পরও দৈনিক ইত্তেহাদ পত্রিকা পূর্ব বাংলায় নিয়মিত আসতো। পরে মুসলিম লীগ সরকার পত্রিকা প্রবেশের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। বাধ্য হয়ে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া কলকাতা ত্যাগ করে ঢাকায় এলেন। ঢাকায় তখন বিরোধী দলের উপরে মুসলিম লীগ সরকারের নির্যাতন চলছে। ১৯৪৮ সালে ৪ জানুয়ারি মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ গঠিত হয়। নেতৃত্বে ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৪৯ সালে ২৩ জানুয়ারি মাওলানা ভাসানীকে সভাপতি, টাঙ্গাইলের শামসুল হককে সাধারণ সম্পাদক করে এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে যুগ্ম সম্পাদক করে পূর্ব-পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন করা হয়। বিরোধী দলের প্রচারের জন্য কোনো দৈনিক পত্রিকা ছিল না। মাওলানা ভাসানী, আতাউর রহমান খান ও শেখ মুজিবুর রহমান সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন— একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করতে হবে। ১৯৪৯ সালের ১৫ আগস্ট ‘সাপ্তাহিক ইত্তেফাক পত্রিকা’ তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। পত্রিকার প্রকাশক ছিলেন ইয়ার মোহাম্মদ খান। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা নিজেরা ফেরি করে বিজ্ঞাপন সংগ্রহ করে পত্রিকাটি চালিয়ে যান। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনে সাপ্তাহিক ইত্তেফাক সাহসী ভূমিকা পালন করে। ২১ ফেব্রুয়ারি গুলিতে নিহত ও আহতদের ছবি দিয়ে পত্রিকা প্রকাশ করা হয়। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক ছাত্রদের উপর গুলিবর্ষণের নিন্দা করে বিবৃতি দেন। তাঁর এই বিবৃতি ২২ ফেব্রুয়ারি সাপ্তাহিক ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

১৯৫৩ সালে পূর্ব পাকিস্তান আইনসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগের প্রয়োজন দৈনিক পত্রিকা। তারা সাপ্তাহিক ইত্তেফাককে ১৯৫৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর দৈনিক পত্রিকায় উন্নীত করেন। ৪ ডিসেম্বর শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী যুক্তফ্রন্ট গঠন করেন। ২১ দফার ভিত্তিতে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন করবে। দৈনিক ইত্তেফাক ২১ দফাকে সামনে রেখে নির্বাচনী প্রচারণা চালায়। এ সময় দৈনিক ইত্তেফাক পূর্ব বাংলার ঘরে ঘরে মুসলিম লীগের নির্যাতন-শোষণের সংবাদ পৌঁছে দেয়। সমগ্র বাঙালি ইত্তেফাকের লেখনীর ফলে ঐক্যবদ্ধ হয়। তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ‘মুসাফির’ নামে রাজনৈতিক কলাম লিখে সমগ্র জাতিকে উজ্জীবিত করেন। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগের ভরাডুবি হয়। ৩০০ আসনের মধ্যে তারা মাত্র ১০টি আসন লাভ করে। ঐতিহাসিক এই বিজয়ের পেছনে রয়েছে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার সাহসী লেখনী। দৈনিক ইত্তেফাক ছিল আওয়ামী লীগের মুখপত্র। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সহযোগিতায় ইত্তেফাকের ঢাকার হাটখোলায় জমি ক্রয় ও প্রেস স্থাপন করা হয়। সোহরাওয়ার্দী ইত্তেফাক পত্রিকাকে সবসময় পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। আতাউর রহমান খান, শেখ মুজিবুর রহমান ইত্তেফাকের প্রচার-প্রসারে কঠোর পরিশ্রম করতেন। ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর জেনারেল আইউব খান সামরিক আইন জারি করে ক্ষমতা দখল করে। শেখ মুজিবুর রহমান, তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াসহ শত শত রাজনৈতিক নেতাকে গ্রেফতার করা হয়।

১৯৬২ সালের ৩০ জানুয়ারি সামরিক সরকার হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে গ্রেফতার করে। তার গ্রেফতারের বিরুদ্ধে ছাত্ররা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মুক্তি ও শিক্ষা নীতি বাতিলের দাবিতে আন্দোলন করে। এ আন্দোলনের অভিযোগে শেখ মুজিবুর রহমান এবং তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে ৫ ফেব্রুয়ারি গ্রেফতার করা হয়। ১৯৬৩ সালের ৫ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগ সভাপতি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বৈরুতে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুতে দৈনিক ইত্তেফাক অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে। ১৯৬৬ সালের ২০ মার্চ পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সম্পাদক নির্বাচিত হলেন শেখ মুজিবুর রহমান ও তাজউদ্দীন আহমদ। একই দিনে আওয়ামী লীগ শেখ মুজিবুর রহমানের ৬ দফা অনুমোদন করে। দৈনিক ইত্তেফাক ৬ দফা সমর্থন করে বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে। ৬ দফার জনপ্রিয়তা দেখে সরকার ভীত হয়ে পড়ে।

১৯৬৬ সালের ৮ মে নারায়ণগঞ্জের জনসভার পরে সরকার শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমেদসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতার করে। তাদেরকে গ্রেফতারের প্রতিবাদে ৭ জুন হরতাল পালিত হয়। পুলিশ অনেককে গুলি করে হত্যা করে এবং আরও নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করে। ১৯৬৬ সালের ১৬ জুন সরকার দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে গ্রেফতার করে এবং পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খান ইত্তেফাক-এর প্রকাশনা বন্ধ করে দেয়। এসময় ইত্তেফাকের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মহীন হয়ে পড়ে। তাদের উপর নির্যাতন, নিপীড়ন নেমে আসে। তারা না খেয়ে মানবেতর জীবনযাপন করে। সরকার মানিক মিয়াকে মুক্তির প্রস্তাব দেয়। কিন্তু মানিক মিয়া সরকারের মুক্তির শর্ত মেনে নেননি। তিনি কারাজীবন বেছে নেন। দীর্ঘ দুই বছর কারাভোগ করার পর ১৯৬৭ সালের মার্চ মাসে মুক্তিলাভ করেন এবং ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থানকালে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার পুনঃপ্রকাশের অনুমতি দেয়। আবার ইত্তেফাক জনগণের কাছে পৌঁছে যায়। গণঅভ্যুত্থানের ফলে আইউব খান ১৯৬৯ সালের ২৪ মার্চ পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। জেনারেল ইয়াহিয়া খান প্রেসিডেন্ট নিযুক্ত হন। তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া পূর্ব পাকিস্তান প্রেসক্লাবের সভাপতি ছিলেন।

১৯৬৯ সালের মে মাসের শেষ সপ্তাহে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া পশ্চিম পাকিস্তানে একটি সম্মেলনে যোগদান করতে যান এবং সেখানে রাওয়ালপিণ্ডির একটি হোটেলে রহস্যজনকভাবে ১ জুন মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুতে বাঙালি জাতি ভেঙে পড়ে। তার মৃত্যুকে স্বাভাবিক হিসেবে তারা মেনে নেয়নি। তাঁর লাশ ঢাকায় এলে লক্ষ জনতার অশ্রুতে সিক্ত হয়ে তিনি আজিমপুরে চিরনিদ্রায় শায়িত হন। তাঁর মৃত্যুতে জাতি তার বিবেক হারালো। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অভিভাবক হারালেন। তাঁর মৃত্যুতে জাতির অপূরণীয় ক্ষতি হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর অবদান ছিল চিরস্মরণীয়। তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের অন্যতম রূপকার, ৬ দফা আন্দোলনের অগ্রসেনানী এবং স্বাধিকার আন্দোলনের প্রবক্তা ছিলেন। তাঁর দু’পুত্র ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন এবং বর্তমান মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর আমরা ৯ মাস যুদ্ধ করে স্বাধীন বাংলাদেশ পেয়েছি। এই স্বাধীনতা লাভের ইতিহাসে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া চিরদিন জ্বলজ্বল করে জ্বলবেন।

খবরটি অন্যদের সাথে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved dainikshokalerchattogram.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com