মঙ্গলবার, ১৬ অগাস্ট ২০২২, ১২:২১ পূর্বাহ্ন

কৃতী সম্পাদক অধ্যাপক মরহুম আফজল মতিন সিদ্দিকী

 স্বপন কুমার মল্লিক

অধ্যাপক আফজল মতিন সিদ্দিকী ছিলেন আশির দশকের একজন শক্তিমান কৃতী সম্পাদক। পত্রিকা সম্পাদনা ছাড়াও অধ্যাপনা এবং অনারারী ম্যাজিষ্ট্রেটও ছিলেন তিনি। পত্রিকা প্রকাশনার পেশাটি ছিল তার পারিবারিক উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত। চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার নানুপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে ১৯৪২ সালের এক জানুয়ারি তঁর জন্ম। তাঁর পিতা খোরশেদ আলম সিদ্দিকী ও তৎকালীন ভারতের বোম্বে থেকে প্রকাশিত ষ্টার অব ইন্ডিয়া পত্রিকার চট্টগ্রাম প্রতিনিধি ছিলেন। তিনি ১৯৯৭ সালে হস্তলিখিত নিয়তি নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করতেন। তিনি চট্টগ্রামের প্রাচীনতম প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান দি দীন প্রেসের স্বত্বাধিকারী ছিলেন। আবার তাঁর পিতামহ মরহুম খান সাহেব মফজলুর রহমান ছিলেন প্রাক্তন ডিষ্ট্রিক সাব রেজিষ্টার। নানা ছিলেন চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী দোভাস পরিবারের জামাতা মরহুম আবুল হাসেম মিয়া। কিন্ত পত্রিকা প্রকাশনা ও সম্পাদনার প্রতি তাঁর ছিল ভীষণ ঝোক। তাই ইসলামিয়া কলেজে অধ্যপনা করার সময় তিনি পুত্র আফজল মতিন ও এডভোকেট আফজল করিমকে পত্রিকা প্রকাশনায় উৎসাহ প্রদান করেন। তাই ১৯৬৯ সালে প্রথমে সাপ্তাহিক ১৯৭৭০ সালে ১লা আগষ্ট প্রথমে সান্ধ্য দৈনিক ও পরে প্রভাতী দৈনিক হিসেবে দি দীন প্রেস সিরাজুদ্দৌলা রোড থেকে প্রকাশিক হতো। আর ছোট ভাই আফজল মতিন সিদ্দিকীর সম্পাদনায় বের হতো সাপ্তাহিক চট্টগ্রাম টাইমস। সম্পাদক ও ব্যক্তি হিসেবে তিনি ছিলেন প্রশংসনীয় চরিত্রে অধিকারী। ব্যক্তি জীবনে তিনি ছিলেন খুবই সহজ, সরল ও উদার। কথিত আছে নানুপুর শাহ আজগরি শাহ বংশে জন্ম নেয়া মরহুম মতিন সিদ্দিকী উপরোক্ত´ দৃজন কামেল মোঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব কর্তৃক উক্ত এলাকায় ইসলাম প্রচারের জন্য প্রেরিত হয়েছিলেন।মরহুম মতিন ছিদ্দিকী-পূর্বপুরুষ আরবস্থান থেকে সরাসরি ভারত আগমন করেন এবং তারা ইসলামের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর ছিদ্দিক (র:) এর বংশধর বলে অবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ তার চট্টগ্রামের ইতিহাস নামক প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন।মরহুম আফজল মতিন সিদ্দিকী চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল এবং কাজেম আলী স্কুলে অধ্যয়ন করেন। তিনি ১৯৫৮ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় কৃতীত্বের সাথে উত্তীর্ন হন। তিনি চট্টগ্রাম সরকারী কলেজ থেকে এইচ.এস.সি. এবং ১৯৬৩ সাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এ এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিতে এম.এ. ডিগ্রি এবং একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি অর্জন করেন। তিনি ১৯৭৫ থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত স্থানীয় ইসলামীয়া কলেজে ইসলামের ইতিহাস বিভাগে অধ্যাপনা করেন। উল্লেখ্য তিনি তিনি তাঁর সকল বেতন ভাতা কলেজ ফান্ডেই দান করে দিয়েছিলেন। তিনি ১৯৮৩ সালে চট্টগ্রাম সদর উত্তর সংসদের সম্পাদক সহ সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৮-৭৯ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সিনিয়র সহ-সভাপতি হিসেবে ছিলেন। সাংবাদিক হিসেবে ১৯৭৮ সালে তিনি যুক্তরাজ্য, একই সময়ে ইউরোপের আরো কয়েকটি দেশ সফর করেন এবং একই সফরের উপর ‘বৃটেনের পথে প্রান্তরে’ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। যা পরবর্তী তে কোন কোন মাধ্যমিক স্কুলে দ্রুত পঠন হিসেবে পাঠ্যভুক্ত করা হয়। তিনি বাংলাদেশ সংবাদপত্র পরিষদ ও সম্পাদক পরিষদের একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন এবং চট্টগ্রাম সংবাদপত্র পরিষদের অর্থ-সম্পাদক ছিলেন। ১৯৯৬ সালে কৃতী সাংবাদিক হিসেবে তাকে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব থেকে এবং মাসিক ফটিকছড়ি থেকে কৃতী সাংবাদিক হিসেবে সংবর্ধনা দেয়া হয়। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি ফটিকছড়ি উপজেলার অন্যতম সেরা বিদ্যাপিঠ নানুপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের পরিচালনা পরিষদের সভাপতি ছিলেন।আমি চট্টগ্রাম আইন কলেজে অধ্যয়নকালীন সময়ে আমার পরম শ্রদ্ধাভজন সাপ্তাহিক চট্টলার প্রধান সম্পাদক ও চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব সভাপতি জনাব আবু সুফিয়ানের সহযোগিতায় দৈনিক পূর্বতারা ৮০’র দশকে দি দীন প্রেস থেকে প্রকাশকালীন সময়ে এই পত্রিকার সাথে যুক্ত হই। তখন সুফিয়ান ভাই ছিলেন এই পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক। আর বার্তা সম্পাদক ছিলেন কৃতী সাংবাদিক মরহুম সৈয়দ মোস্তফা জামাল। এই সময় নির্বাহী সম্পাদকের বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাথে যুক্ত থাকার সুবাদে মাঝে মাঝে জম্পেস আড্ডায় দেখা যেত বর্তমান মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন ,বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মঈনুদ্দিন হাসান চৌধুরী, প্রয়াত ছাত্রলীগ নেতা গোলাম মোস্তফা বাচ্চুসহ প্রথম সারির নেতাদের। আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষাগুরু মরহুম অধ্যাপক শামসুল ইমলাম সাহেবের (জনাব আবু সুফিয়ান সাহেবের বড় ভাই) একটি পত্র তৎকালীন নির্বাহী সম্পাদকের হাতে পৌছালে তিনি সম্পাদক আফজল মতিন সিদ্দিকীর কাছে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে নির্বাহী সম্পাদকের প্রস্তাবক্রমে তাঁর পত্রিকায় সহ সম্পাদক হিসেবে নিয়োগে সম্মত হন।সহজ সরল নিরহংকার এই গুণী ব্যক্তিটি সেই দিনই আমার কাজের অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গ তুলে আলাপচারিতায় বলেছিলেন-সাংবাদিকরা যে কোন সত্য প্রকাশ করার অধিকার রাখেন বা পারেন। তিনি বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করে আরো একটি বিষয় উপস্থিত নির্বাহী সম্পাদক আবু সুফিয়ান, পরিচালনা সম্পাদক এ্যাডভোকেট আফজল করিম সিদ্দিকী ও বার্তা সম্পাদক সৈয়দ মোস্তফা জামাল সাহেবের উপস্থিতিতে বলেছিলেন, জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বহির্বিশ্বের সাথে দেশের সম্পর্ক খারাপ হতে পারে এমন সত্য প্রকাশ করা আমাদের উচিত হবে না। পরে এক সময়ে বার্মার সৈন্যরা বাংলাদেশে ট্রেনিং পাচ্ছে-এমন একমাত্র সংবাদের জন্য যখন তৎকালিন জাতীয় পত্রিকা ‘দৈনিক দেশ’ বন্ধ হয়ে গেল তখনই তার সেই সতর্কতামূলক পরামর্শটি কেন দিয়েছিলেন তা অক্ষরে অক্ষরে বুঝতে পেরেছি। একই ভাবে ধর্মীয় নিউজের বিষয়টি বুজতে পারি যখন ভারতের বাবরি মসজিদের সংবাদটি বাংলাদেশ সহ বিভিন্ন স্থানে আগুন জালিয়ে দেয়। এভাবে কর্তব্যপরায়নতা, ধর্মীয় সহনশীলতা ও বন্ধু বাৎসল্যসহ অনেক বিষয় শ্রদ্ধেয় সম্পাদকসহ সহকর্মীদের কাছ থেকে শেখার সুযোগ হয়েছিল আমার।বহুমানবিক গুণে গুণান্বিত কৃতী সম্পাদক মরহুম আফজল মতিন সিদ্দিকী আমাকে সাংবাদিকতার পাশাপাশি চট্টগ্রাম আইন কলেজে এল.এল.বি. এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এম.এ. পড়ান সুযোগ দিয়ে আমাকে কৃতজ্ঞতা পাশে আবদ্ধ করেছেন। আমৃত্যু তাঁর সে সহযোগিতার কথা আমার স্মরণ থাকবে।অধ্যাপক মরহুম আফজল মতিন সিদ্দিকীর অনুজ আফজল রহিম সিদ্দিকী (এম.এ.এল.এল.বি.) ও চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের স্থায়ী সদস্য। উপ-মহাদেশের প্রখ্যাত ওলীয়ে কামেল রাহনুমায়ে শরীয়ত ও তরিকত আল্লামা হাফেজ্বকারী সৈয়দ মুহাম্মদ তৈয়ব শাহ (মা: জি: আ:)’র প্রধান খলিফা বিশিষ্ট ব্যবসায়ী চট্টগ্রাম পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান মরহুম আলহাজ্ব নূর মোহাম্মদ আল কাদেরী (রা:) এর জামাতা ছিলেন। তিনি দুই কন্য ও এক পুত্র সন্তানের জনক । গত ২০০৯ সালের ৪ জুলাই কৃতী এই সম্পাদক তার চট্টগ্রামস্থ নিজ বাড়ি চন্দনপুরায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

খবরটি অন্যদের সাথে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved dainikshokalerchattogram.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com