শনিবার, ২৩ অক্টোবর ২০২১, ০৮:১১ অপরাহ্ন

আপাও পশ্চিমে তাকিয়ে অপেক্ষা করতেন ভাইটি আসবে বলে

নাছির আহমেদ

স্কুল থেকে ফিরলে আম্মা তাগাদা দিতেন আপার বাড়িতে (নোয়াগাঁও) যেতে। আপাও পশ্চিমে তাকিয়ে অপেক্ষা করতেন ভাইটি আসবে বলে। বাজারের ব্যাগ আর টাকা নিয়ে স্থানীয় হাসনাবাদ বাজারে কখনো যেতাম সোৎসাহে, কখনো দায়িত্বে।

৬০-৮০ টাকায় ১ কেজি ইলিশ, কখনো ৯০-১০০ টাকায় গরুর মাংস, ২ পদ তরকারি, তেল-ডাল-নুন-মসলা-সাবান ১৫০ টাকার মধ্যেই সারত। তারপর সদাইসমেত ব্যাগ টেনে আবার বোনের বাড়ি।

শীতকালে আশিয়াদারি গ্রামের মাটির শুকনা রাস্তা আর বর্ষা মরসুমে বা বন্যায় গর্ত এড়িয়ে হেঁটে হেঁটে (কত যে চিৎপটাং হয়েছি) এই ব্যাগ টানার মধ্যে একটা অ্যাডভেঞ্চার ছিল আমার কাছে। আসার সময় আপা ৫-১০ টাকা পকেটে ঢুকিয়ে দিতেন। পরদিন চিতোষী আরএম উচ্চবিদ্যালয়ের সামনে চানাচুর, আমড়া, তেঁতুল-বরই-চালতার (স্যাকারিনসহ) আচার সাবাড় করে এই টাকার শ্রাদ্ধ করতাম। আবার ঈদের জন্যও জমাতাম।

যখন বাড়ির পথে, মাগরিবের আজান ভেসে আসত। খেয়া পারের জন্য মাঝি গোলাপ (প্রাইমারির ক্লাসমেট) আশপাশেই থাকত। হাঁক দিলেই হাজির সে (কখনো তারা বাবা)। খালের বুকে ছলাৎ ছলাৎ করে যখন তার বইঠা চলে, পানির নিচে আমার দিকে তাকিয়ে থাকত ঢ্যাপ শালুক (প্রাকৃতিক জলসম্পদ)। টেনে ছিঁড়তাম। তারপর গোলাপকে ১/২ টাকা দিয়ে শালুক খেতে খেতে আমি বাড়ির কাছে।

ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি─ কবে যে বড় হয়ে গেছি। তত দিনে ভাগিনা-ভাগনিও দায়িত্ব নিতে শিখেছে। আর আমারও মিলেছে ছুটি। প্রবাসে থাকা ভগ্নিপতিও তার ঋণ শোধ করার জন্য আসার সময় শার্ট পিস, ঘড়ি, সেন্ট, রেডিও নিয়ে আসতেন। আমি তখন থেকেই ঢাকা-ক, খ, অনুরোধের আসর ও সৈনিক ভাইদের অনুষ্ঠান ‘দুর্বার’ শুনে শুনে ভক্ত।

মাঝখানে চলে গেলে আরও ১০টি বছর। ততদিনে আমি শহুরে। আমার শ্রদ্ধেয় বড় বোন (ভাইবোনদের মধ্যে সবার বড়) হঠাৎ অসুস্থ। তার বড় ছেলে তাকে নিয়ে দিগবিদিক ছুটছে। কী আর অসুখ, হয়তো সামান্য জ্বর। সেরে যাবে বলে মনকে বুঝাই। আর প্রস্তুতি নিচ্ছি ভালো একজন চিকিৎসকের কাছে নেব আপাকে। খিদমাহ হসপিটালের চিকিৎসক বুঝতে পেরে বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন ওষুধ ‍দিয়ে।

প্রথম আলো অফিসে সদ্য যোগ দিয়েছি। রেডি হচ্ছি অফিসে যাব। হঠাৎ ফোন। ‘তোর আপা আর নেই’ বলে ওপাশ থেকে কেঁদে উঠলেন বাবা। আমি নির্বাক, স্তব্ধ। আমার শিরা বন্ধ হয়ে এল। এটা মিথ্যা কথা। আমার বোন নয়, অন্য কারও বোন বলে মনকে শক্ত করি। কিন্তু বাবা নিশ্চিত করলেন আমার আপা আসলেই আর নেই।

অফিসে ফোন করে বসকে (শ্রদ্ধেয় মোরশেদ ভাই, বর্তমানে বার্তা সম্পাদক, দৈনিক ঢাকা টাইমস) জানালে তিনি ছুটি দিয়ে দিলেন। আমি বাবাকে বলে দিই, আমি আসার আগে যেন দাফন-কাফন না হয়। আপার সঙ্গে আমার অনেক কথা আছে। কিন্তু…

দিনটি ছিল ২০১২ সালের ১২ মার্চ। বাসা থেকে বেরিয়েছি, তবে কীভাবে যাব, সেই চিন্তায় অস্থির। কারণ দেশব্যাপী একটি দলের ‘ঢাকা চলো’ কর্মসূচি। ক্ষমতাসীনরা করল গাড়ি বন্ধ (দুটি দলই আমার অপছন্দের সেদিন থেকে)। ছুটে গেলাম কমলাপুর। ট্রেন ছাড়বে তিনটায়। সেই হর্ন বাজল পাঁচটায়। আমি যখন ভৈরব সেতুর বর্জধ্বনি শুনি, ততক্ষণে আপাকে শীতল মাটিতে শুইয়ে দিলেন সবাই।

আপার আত্মাটুুকু তবু আমায় টেনে নিল বাড়িতে। যখন পৌঁছি, তখন রাত ১টা। পরদিন আপার সঙ্গে আমার কথা হয়েছে, অনেক কথা, নীরবে। আর যাইনি আপার কাছে, রাগে, ক্ষোভে, অভিমানে।

আজ আপা ৫৩ হতেন। বহুদিন পর আবার দেখা হলো আপার সঙ্গে। তবে আপার জন্য দোয়া করেছি, ‘আয় খোদা! রহমান। বেহেশত নসিব করিও আমার আপার প্রাণ।’

ফেসবুক থেকে সংগ্রহীত

খবরটি অন্যদের সাথে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved dainikshokalerchattogram.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com