শনিবার, ২৩ অক্টোবর ২০২১, ০৮:৩৮ অপরাহ্ন

মানুষ মানুষের জন্য

টরেন্টো থেকে মারুফ শাহ চৌধুরী

উপমহাদেশের বিখ্যাত গায়ক ভূপেন হাজারিকার মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য এই গানটি শুনে নি এমনই মানুষ খুব বিরল। মানুষ মানুষের জন্য এটা হল বিশ্বমানবতার ধর্মের মূলমন্ত্র মানবধর্ম। মানবের মাঝে আমি বাঁচিবার চাই। সেখানে ধর্ম সমাজ রাষ্ট্র বড় কথা নয় বড় কথা মানুষ। প্রখ্যাত সাহিত্যিক বিমল মিত্র তিনি বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে বড় উপন্যাস লিখেছেন এ পর্যন্ত ২

খন্ড সমাপ্তকড়ি দিয়ে কিনলাম। খুব জনপ্রিয় উপন্যাস। যারা সত্যি কারের পাঠক তাদের বইটি এমন করে আকৃষ্ট করে রাখে শেষ না করে উঠতে পারবেন না। এই উপন্যাসের শেষ লাইন উপন্যাসের নায়ক দীপঙ্কর ডাকনাম দীপু তার স্কুল জীবনের শিক্ষক প্রানোনাথ সেই শেষ কথাগুলো, দীপু, জীবনে জজ ব্যারিস্টার হও, মহাত্মা গান্ধী হও, বা রক ফেলার হও আমার আপত্তি নেই, তবে সর্বপ্রথম তুমি মানুষ হবার চেষ্টা করো। কারণ পৃথিবীতে সত্তিকারের মানুষের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। আজ আমি সেই মানুষদের কথা বলছি। ভারতের চিত্র নায়ক বিশেষ করে দক্ষিণ ভারতের কমল হাসান। চলচ্চিত্র জগতের সাথে যারা জড়িত সিনেমা জগৎ সম্বন্ধে যারা ওয়াকিবহাল তাদের কাছে কমল হাসানের নাম অজানা নয়। বিখ্যাত অভিনেতা সারিকা তার স্ত্রী। কমল হাসান কে আমি প্রথমে মুসলমান মনে করতাম। পরে জানতে পারলাম তিনি মুসলমান নয় তবে হাসান পদবী তিনি কেন গ্রহণ করে আছেন তার একটি পটভূমিকা আছে।বহুদিন আগে এক ভারতীয় সিনে মেগাজিনে এ সম্পর্কে একটি সংবাদ আমি দেখেছিলাম সেটাই এখন বলছি। কমল হাসানের পিতার এক বন্ধুর নাম ছিল হাসান। হাসান এবং কমল হাসানের পিতা বামপন্থী রাজনীতি করতেন। যারা সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে সর্বহারারা রাজত্বের স্বপ্ন দেখতো তারা ছিল দুই বন্ধু। একদিন তাদের গোপন আস্তানায় পুলিশ হামলা চালায়। পুলিশ গুলি ছোড়ে কমল হাসানের পিতার বুক লক্ষ করে ঠিক সেই মুহূর্তেই কমল হাসানের পিতার বন্ধু যার নাম ছিল হাসান। বন্ধুকে বাঁচাবার জন্য নিজেই বুক পুলিশের সামনে পেতে দেয় হাসান ঘটনাস্থলেই নিহত হয় এবং কমল হাসানের পিতা বেঁচে যায়। তখন কমল হাসানের পিতা তার বন্ধুর স্মৃতিকে অমর করে রাখার জন্য ওসিয়ত করে যায় যে তার বংশে যারা জন্মগ্রহণ করবে সবার নামের পিছনে যেন হাসান উপাধি লাগায়। এইযে আত্মত্যাগের যে প্রতিদান এখানে কাজ করছে যেটা বড় ধর্ম সেটা হল মানবতা। এইতো দুদিন আগে ফেসবুকে দেখলাম কোন একটি উপজেলা মুসলমান চেয়ারম্যান এর মৃত্যুর পর তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিন্দু সম্প্রদায়ের তিনি তিন দিন ধরে তার সমাধি পাশে এ একাধারে কেঁদে যাচ্ছেন আমরা তার সচিত্র প্রতিবেদন দেখেছি। এখানে ধর্ম কোন প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায়নি। সামনে এসে দাঁড়িয়েছে মনুষ্যত্ব। যেন সকলের তরে সকলে আমরা। প্রত্যেকে আমরা পরের তরে। আমার মনে পড়ছে আমার প্রতিবেশী জেলেপাড়া রসবলা জলদাসীর কথা যার আসল নাম ছিল ব্যাঙছনী। খুবই গরিব ঘরের মেয়ে। বিধবার সাজ সজ্জা থাকতো। মাথা ন্যাড়া করে রাখত। আমাদের প্রতিবেশী দুই একজন প্রতিবেশীর বাড়িতে ফাইফরমাশ কেটে জীবিকা নির্বাহ করতো অন্যান্য জেলেনীদের মত মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করত না। সম্ভবত 72 সাল। আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। অকালে মুক্তিযুদ্ধেপিতা কে হারিয়েছি। পরিবারের বড় সন্তান হিসাবে সংসারের সব দায়িত্ব আমার কাঁধে। আয় বলতে পিতার সম্বল পেনশনের 200 টাকা। খুব টেনেটুনে হিসাব করে চলতে হতো। একদিন বাজার থেকে রসবালা জলদাসী যাকে আমরা বুবু বলতাম আমি রাস্তায় দেখলাম তার পরনের কাপড় এতো ছিন্ন বসন কোনমতে লজ্জা নিবারণ করতে পারছিল না। আমি দেখে খুব অবাক হলাম এবং সেই মুহূর্তে আমার মনের মধ্যে আমার প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম খোলস ছেড়ে মানবধর্ম জেগে উঠলো ।আমার পকেট এ 100 টাকার একটি নোট ছিল আমি তাকে দিয়ে দিলাম বললাম বুবু এটা দিয়ে তোমার বসন কিনো এবং লজ্জা-নিবারণ করো। সেই সময় এই 100 টাকার বহু মূল্য ছিল।। সেই 100 টাকা দিয়ে দেওয়ার ফলে আমার সংসারের বহু হিসাব কাটছাঁট করতে হয়েছিল কিন্তু তখন আমার মনে পড়ে গেছিল বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোট গল্প কাবুলিওয়ালার কথা। কাবুলিওয়ালা গল্পের মিনি, সেই রহমতের মিনি। বহু বছর কারাভোগের পর মিনিকে যখন দেখতে আসলো সেদিন ছিল মিনির বিয়ে। সেদিন রবীন্দ্রনাথ রহমতকে কিছু টাকা দিয়েছিল এই ভেবে সেও পিতা আমিও পিতা। সেই টাকা দেওয়ার ফলে মিনির বিয়েতে আলোকসজ্জা হয়নি, এতে রবীন্দ্রনাথ দুঃখ পান নি তিনি বলেছেন কাবুলিওয়ালা রহমত হৃদয়ের আশীর্বাদ মিনির শুভ বিবাহেরযাত্রাপথ কুসুমাস্তীর্ণ হয়ে গিয়েছিল। সেদিন রসবালা চোখের আনন্দ অশ্রু আমার সব ব্যথা ভূলিয়ে দিয়েছিল। টাকা পেয়ে রসবালা আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে রইল। হঠাৎ টাকা হাতে নিয়ে সে মাথার উপরে নিয়ে কতক্ষন দাঁড়িয়ে রইল। দুটি চোখ অশ্রুতে পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। আস্তে আস্তে সে আমাকে ছেড়ে চলে গেল। আমি তার চলার দিকে রইলাম।আমার মন একটি অপার্থিব আনন্দে ভরে উঠলো। যে আনন্দ কোটি টাকা দিয়ে ক্রয় করা যায় না । এটা সৃষ্টি কর্তার থেকে প্রাপ্ত আনন্দ অনুরিত অনুভূতি। সেজন্য বলা হয়েছে মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত। সৃষ্টির সেরা। সেই পথ ধরে আলোক রশ্মি দেখেছিলেন একজন সত্তিকারের মায়ের মধ্যে তিনি হলেন মাদার তেরেসা। কলিকাতার কালী মন্দিরের পুরোহিতের কথা।

যেভাবে আনন্দে ভরে উঠেছিল কলিকাতার কালী মন্দিরের সেই পুরোহিতের। যার কলেরা হয়েছে বলে পুরোহিতের সতীর্থরা তাকে রাস্তায় ফেলে দিয়েছিল। নোবেল প্রাইজ বিজয়ী মাদার তেরেসা সে পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন এবং সেই কলেরা রোগে আক্রান্ত মৃতপ্রায় পুরোহিতকে বুকে তুলে নিলেন এবং সেবা-শুশ্রূষা করে ভালো করে দিল। পরে সেই পুরোহিতের উক্তি আমি 25 বছর কালী দেবীর সাধনা করেছি মাকে পাওয়ার জন্য। পাথরের মা সাড়া দেয়নি। আজ একজন জীবন্ত সত্তিকারের মায়ের সন্ধান পেলাম। শত প্রণাম আমার মা মাদার তেরেসার প্রতি। আমার সেই রসবালা জলদাসী বহুদিন আগে না ফেরার দেশে চলে গেছে। মাদার তেরসা আর বেঁচে নেই।আসুন আমাদের মধ্যে ধর্মীয় সংকীর্ণতা, সাম্প্রদায়িকতা ঊর্ধ্বে উঠে আমরা প্রমান করি আমাদের সর্বপ্রথম পরিচয়আমরা মানুষ। কড়ি দিয়ে কিনলাম নায়ক দীপঙ্করের শ্রদ্ধেয় প্রধান শিক্ষক যে কথাটা বলেছে দীপুকে আমি সে মহামূল্যবান বাক্যর আবার প্রতিধ্বনি’ করছি। পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। আসুন আমরা মানুষ হই। ভূপেন হাজারিকার সেই গানের ধ্বনি আমাদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ুক, মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য। তাহলে হয়ত তখন আমরা বলতে পারব। কোথায় স্বর্গ, কোথায় নরক, কে বলে তা বহুদূর। মানুষের মাঝে স্বর্গ নরক, মানুষেরই সুরাসুর। প্রীতি ও প্রেম যবে মিলি পরস্পরে। স্বর্গ আসিয়া দাঁড়ায় তখন আমাদের কুঁড়েঘরে। আজ এখানেই ইতি থাকছে। ভালো থাকুন ফেসবুকের বন্ধুরা।

খবরটি অন্যদের সাথে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved dainikshokalerchattogram.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com