বুধবার, ২৩ জুন ২০২১, ০২:৪৪ পূর্বাহ্ন

৬৪ ইংরেজিতে মোবারেকিয়া পল্লী উন্নয়ন সমিতির সাংস্কৃতিক উৎসব,নাটক ও স্মৃতিময় সময়

টরেন্টো থেকে মারুফ শাহ চৌধুরী

68 ইংরেজিতে চট্টগ্রাম রাউজান থানার গহিরা মোবারেকিয়া পল্লী উন্নয়ন সমিতির উদ্যোগে সাংস্কৃতিক উৎসব ও সফল প্রযোজনা ঐতিহাসিক জাহাঙ্গীর নাটক মঞ্চায়নের প্রেক্ষাপট। আজকালকার নতুন প্রজন্ম ইতিহাস জানে না 60 দশকের শেষে স্বাধীনতা সংগ্রামের শুরু হওয়ার 4 বছর আগে মোবারক খিল গ্রামের তরুণ সমাজ রাউজানের আর্থসামাজিক পটভূমিকায় বিবর্তনের একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিল। সেসময় রাউজানের দুটি ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ এবং ছাত্র ইউনিয়ন মেনন গ্রুপ মূল নেতৃত্বে ছিল এই গ্রামের তরুন সমাজ। ছাত্রলীগে শহীদ নাজিম উদ্দিন খান। শফিকুল আলম খান। আমি মারুফ শাহ। সিরাজউদ্দৌলা। বকতিয়ার উকিলের বাড়ির মুক্তিযুদ্ধা আহসানুল্লাহ। প্রমূখ এবং ছাত্র ইউনিয়নের মোজাম্মেল হক চৌধুরী এবং বকতিয়ার উকিলের বাড়ির মরহুম নাজিম উদ্দিন চৌধুরী, রফিকুল ইসলাম প্রমূখ। 68 সনে আমাদের এসএসসি পরীক্ষা শেষ শহীদ নাজিম উদ্দিন এরা গহিরা কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র সেই সময় মোবারক খিলেরপ্রত্যেকদিন বৈকালিক আড্ডা বসতো মোবারক খীল প্রাইমারি স্কুলের মাঠে। আড্ডায় আমরা যারা শরিক হতাম শহীদ নাজিম উদ্দিন খান। শফিকুল আলম খান। মরহুম গোলজার হোসেন বকতিয়ার উকিলের বাড়ির মরহুম সলিমুল্লাহ, মোঃ আব্দুল কাইয়ুম মরহুম সিরাজউদ্দৌলখান। মরহুম গিয়াসউদ্দিন ছোট মিয়া। মরহুম হারুনুর রশিদ ফজলুর রহমান চৌধুরী বাড়ির। মাস্টার খুরশেদ আলম খান। মরহুম নোমান খান, জুনিয়রদের মধ্যে নওশের আলী খান,, মহিউদ্দিন আরো অনেকে। সেসময় আমাদের সিনিয়র মধ্যে ছিল মরহুম গোলাপের রহমান চৌধুরীর ভ্রাতুষ্পুত্র পুতুল বদ্দা এবং আমাদের বাড়ির মরহুম আইয়ুব খান। সুলতান মাহমুদ খান। চাচা নুরূছছাপা চৌধুরী প্রমূখ। আমরা ঠিক করলাম বহুদিন মোবারক খিল গ্রামে নাটক মঞ্চায়ন হয়েছে অনেক বছর আগে। এবার আমরা একটি নাটক মোবারকিয়া পল্লী উন্নয়ন সমিতির উদ্যোগে একটি নাটক মঞ্চায়ন করব। যেই কথা সেই কাজ। সেই সময় হাটহাজারী গড়দুয়ারা গ্রাম সাংস্কৃতিক কার্যক্রম অগ্রগামী ছিল। আমাদের হালদা নদীর ওপারে গড়দুয়ারা গ্রাম। সেখানে নাটক মঞ্চায়ন হত এবং শ্যামসুন্দর বৈষ্ণব এর মত শিল্পীরা সেখানে অংশগ্রহণ করত। আমাদের গ্রাম থেকে নদী পার হয়ে সেই সব অনুষ্ঠান দেখতে যবুকরা গড়দুয়ারা অনুষ্ঠান দেখে শেষ রাত্রে বাড়ি ফিরত। যোগাযোগব্যবস্থায় গড়দুয়ারা আমাদের চেয়ে পশ্চাৎপদ ছিল। সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম সামাজিক নাটক আমাদের পল্লীগ্রামে জমবে না আমরা ঐতিহাসিক নাটক করব। সিদ্ধান্ত হল জাহাঙ্গীর নাটক করব এবং পরিচালক হিসাবে কুন্ডেশ্বরী সাধন মাস্টার কে নিয়ে আসব। এখন ফানড জোগাড় করতে হবে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য নামকরা শিল্পী আনতে হবে বিশেষ করে শেফালী ঘোষ কি অবশ্যই চাই। সেসময় শেফালী ঘোষের নাম শুনলে মাঠ পরিপূর্ণ হয়ে যেত এবং পার্শ্ববর্তী গ্রাম থেকে অনেক দর্শক আসতো শেফালী ঘোষের গান শোনার জন্য। অতএব আমাদের শেফালী ঘোষ কে চাই। এখন আমাদের হাতে কোন টাকা পয়সা নাই। মুরুব্বিদের আমাদের পাকড়াও করতে হবে।সে সময় আমাদের বাড়ির মরহুম হাজী দলিলুর রহমান এর একমাত্র সন্তান কামাল উদ্দিন খান আমাদের সবার প্রিয় কামাল বদ্দা আমাদের ছিল একমাত্র ভরসা। তিনি ছিলেন পল্লী উন্নয়ন সমিতির সহ-সভাপতি। সেসময় কামাল বদ্দা অনেক পয়সার মালিক ছিলেন। তিনি যখন আমাদের মোবারক খীল প্রাইমারি স্কুলের সামনে দিয়ে হাটতেন আমরা স্কুলের দেওয়ালে বসে থাকলে কামাল বদ্দা কে দেখলে আমরা সবাই স্কুলের দেয়ালথেকে নিচে নেমে যেতাম। আর সবাই মিলে কামাল বদ্দা কে সালাম দিতাম। কামাল বদ্দা সহজ-সরল মানুষ আমরা সবাই মিলে উনার থেকে সেই যুগে আটশত টাকা আদায় করলাম। শর্ত একটি শেফালী ঘোষকে আনতে হবে। শেষ সময়ে পাকিস্তান আমলে আটশত টাকা মানে অনেক টাকা 200 টাকায় তখন স্বর্ণ ভরি। কামাল বদ্দা রিহার্সেল আসিলে আমরা সবাই দাঁড়িয়ে যেতাম তিনি বসলে আমরা বসতাম। যাক যে টাকা দিয়েছে সে টাকা দিয়ে নারীর চরিত্রে নারী আনা সম্ভব নয় তদুপরি শেফালী ঘোষের খরচ মঞ্চ লাইট মাইক লেবার খরচ ইত্যাদি আছে। জাহাঙ্গীর নাটকের নারী চরিত্র মেহেরুন্নেসা বা নুরজাহান। এই চরিত্র হল প্রধান চরিত্র। তখন শহীদ নাজমুদ্দিন খান বলল প্রধান নারী চরিত্রে সে অভিনয় করবে। এমনি দেখতে শহীদ নাজিম টকটকে ফর্সা রং ছিল। নাজিমুদ্দিন নারী চরিত্রে অভিনয় করার দরুন অনেকে নারীর চরিত্রে অভিনয় করার জন্য উৎসব করে তারমধ্যে শফিউল আলম খান মতিবিবির চরিত্র, সিরাজউদ্দৌলা ফিরোজা বেগমচরিত্র। মরহুম গিয়াস উদ্দিন খান ছোট মিয়া রানী যোধবাই চরিত্র অভিনয় করে। নওশের আলী খান তখন কিশোর বয়সে খুব সুন্দর ছিল সেকি নারী চরিত্রে অভিনয় করেছে মেকাপম্যান তাকে এমন ভাবে সাজিয়েছে সে যখন শেফালী ঘোষের সাথে বসে ছিল তারাও ধরতে পারেনি নওশের আলীখান একজন ছেলে। আমি প্রধান সেনাপতি শিকোর খাঁ একটি প্রধান সেনাপতি চরিত্রে অভিনয় করেছিলাম। মাস্টার খোরশেদ আলম সেনাপতি কিরন সিং। মরহুম গুলজার হোসেন একটি বিদূষক চরিত্রে অভিনয় করেন তার সাথে ছিল সখি ফিরোজা রূপী সিরাজউদ্দৌলা খান। মানসিংহ চরিত্রে অভিনয় করে সুলতান মাহমুদের বাড়ির মরহুম হারুনুর রশিদ এবং অন্যান্য চরিত্রে আহসান উল্লাহর বড় ভাই মরহুম সলিমুল্লাহ খান। জল্লাদের চরিত্রে মরহুম নমান খান। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে শেফালী ঘোষ সেকান্দার, ভাওয়াইয়া শিল্পী ইসহাক এসেছিল। তার গাওয়া আগার ডুবু ডুবু পাছা ডুবুডুবু সে সময় বেশ জনপ্রিয় ছিল। আর একটা কথা ভুলে গেছি সম্রাট জাহাঙ্গীর চরিত্রে অভিনয় করেছিল পরিচালক সাধন মাস্টার তিনি একজন প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। রূপসজ্জা ও মঞ্চে কাঙ্গাল হরি । আমি প্রধান সেনাপতি এবং মেহেরুন্নেসা একটি দীর্ঘ সংলাপ ছিল পানিপথের যুদ্ধ কে নিয়ে। মেহেরুন্নেসা সে সময় মোগলদের হাতে পাঠানদের নির্যাতিত হওয়ার দৃশ্য টুকু আমাকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে আর আমি বলছি আমি মোগলসাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারবোনা। তারপর কিরন সিংয়ের ষড়যন্ত্র আমাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। শেষ দৃশ্য ছিল একটি বিরাট সংলাপ।। এবং দাজ্জালের ভূমিকায় কাল পোশাকে নোমান খান এবং তার বিকট হাসি দর্শকদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল। আমাদের গ্রামের সব মুরুব্বী সেই নাটকের প্রথম সারিতে বসেছিল। তাদের মধ্যে মরহুম জ্যাঠা রুহুল আহমদ চৌধুরী। মরহুম চাচা গোলাপ রহমান। মরহুম চাচা আব্দুস সবুর খান মানিক। চাচা মরহুম আবু তাহের খান। কামাল উদ্দিন খান অন্যান্য রা ছিল। শেফালী ঘোষের আসার নাম শুনে কোতয়ালী গোনা দল ঈ নগর থেকে অনেক দর্শক এসেছিল। সম্পূর্ণ মাঠ ধানক্ষেত লোকে লোকারণ্য। সে নাটক একটি মজার দৃশ্য ঘটেছিল। যা এখনো মনে হলে হাসি ধরে রাখতে পারি না।প্রথম দৃশ্য ছিল মরহুম গোলজার হোসেন খান ও সখি ফিরোজা রূপী সিরাজউদ্দৌলা খান। প্রথম দৃশ্য ছিল একটি নাচের দৃশ্য। গোলজার ফিরোজা কে সাথে নিয়ে এসে বলবে কই গো সখি? নাচো গাও। এ সময় সামনের মুরুব্বি দর্শকের সারিতে একটি চাপা হাসির গুঞ্জন। আমার পাট ছিল নাটকের মধ্যখানে এবং শেষ দৃশ্য। হাসির কারণ খোঁজার জন্য আমি মঞ্চের বাইরে এলাম দেখি আমার হাসি পেল ফিরোজা চরিত্রে সিরাজউদ্দৌলা কে যারা সাজিয়েছে তারা নারী চরিত্রের কৃত্রিম স্তন যে বেঁধেছে অসাবধানবশত তার বাঁধন ঢিলে হওয়াতে ফিরোজা রুপী সিরাজউদ্দৌলার বুকের স্তন একটি উপরে একটি নিচে হয়ে যায়। যার জন্য আমাদের মুরুব্বী ও সাধারণ দর্শক হাসতেছিল পরে তা ঠিক করে দেওয়া হয়। ওই নাটকে মেয়েদের জন্য স্কুলের বারান্দায় মাছ ধরা বেড়া দিয়ে আলাদা ব্যবস্থা করা হয়। বহু মেয়ে দর্শক সেই নাটক উপস্থিত ছিল। সেসময় একটি সফল মঞ্চায়ন তারপরের দিন যখন স্কুলে গিয়েছি সবাই শুধু শেফালী ঘোষের গান ওরে ও সাম্পানওয়ালা তুই আমারে করলি দেওয়ানা। মোবারকখীলের অনেক নতুন প্রজন্ম এই ইতিহাস জানে না। সে জন্য তুলে ধরলাম। তবে এ নাটক মঞ্চায়নের জন্য আমরা মরহুম কামাল বদ্দা কাছে অনেক ঋণী। এবং এই নাটকে যারা অভিনয় করেছে তাদের মধ্যে অনেকে না ফেরার দেশে চলে গেছে এবং রাউজান থানার মুজিব বাহিনী প্রধান
মুক্তিযোদ্ধা শহীদ নাজিম উদ্দিন খান একটি প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছে যার জন্য নাটক মোবারক খিলের ইতিহাসে স্মরণীয় থাকবে কেউ ভোলে না কেউ ভোলে।

খবরটি অন্যদের সাথে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved dainikshokalerchattogram.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com