বুধবার, ২৩ জুন ২০২১, ০১:৪৫ পূর্বাহ্ন

ইতিহাস ও ঐতিহ্য হারানো অতীতের চিন্নসূত্র : বিলুপ্ত ঐতিহাসিক স্থান” চম্পকনগর “

আবদুল মান্নান

রঘুনন্দন পাহাড়ের পাদদেশে “ফেনী নদী” বেষ্টিত ভাটির বাঘ শমসের গাজীর রাজপ্রাসাদ, সামরিক কেল্লা, রাজারবাড়ির গোপন সুরঙ্গের পথের স্মৃতিচিহ্ন,চম্পকনগর, ছাগলনাইয়া। তিনি এই এলাকা ও ত্রিপুরার দক্ষিণ ,পশ্চিমাঞ্চলের শাসক ছিলেন এবং ১৭৫৯ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির আগ্রাসন প্রতিহত করতে গিয়ে মৃত্যু বরণ করেন। বাংলাদেশের অধিকাংশ অঞ্চল নবীন পলিমাটি, বন্যা ও অতিবৃষ্টি ফলে পাহাড় পর্বত হতে বয়ে আনা মাটিতে গঠিত হলেও চট্টগ্রাম সহ আমাদের এই জনপদের অধিকাংশেরই ভূমি গঠিত হয়েছিল দশ লক্ষ বছর পূর্বে ভূ-ভাগ উৎক্ষিপ্ত হওয়ার সময় কালে ‘প্লায়োস্টনিক ” যুগে। সমগ্র দেশের বহু অঞ্চল যখন সাগরে অতল জলে নিমজ্জিত ছিল,তখনও চট্টগ্রাম সহ বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলের অস্তিত্ব ছিল এবং আদি কালে এই অঞ্চলে জনবসতি গড়ে উঠেছিল। কিছু প্রত্ম-নিদর্শন প্রাপ্তি এই ধারণাকে আরও সুদৃঢ় করে। সীতাকুণ্ডে চন্দ্রনাথ পাহাড়ের পাদদেশে ১৮৮৬ সালে পাওয়া প্রাগৈতিহাসিক যুগের অশ্মীভূত কাঠের “কৃপাণ” এবং এই কৃপাণের ৪টি বর্তমানে লন্ডনে বৃটিশ মিউজিয়ামে, ১টি কলিকাতা মিউজিয়ামে ও ১টি বাংলাদেশের জাতীয় যাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। ১৯৬৩ সালে ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া উপজেলা আবিষ্কৃত প্রত্ম-প্রস্তর যুগের পাথরের বিবর্তিত “হাত কুঠার” যাহা বর্তমানে জাতীয় যাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। কালের বিবর্তনে অত্রাঞ্চলের সাগরের পলিমাটি ও অতি বৃষ্টির কারণে পাহাড় থেকে নদী প্রবাহে বয়ে আনা মাটির সংমিশ্রণে সাগর ভরে ভূমি গঠিত হয়ে, লোকালয় সৃষ্টি হয়। এইভাবে, চট্টগ্রামের মিরসরাই ও ফেনী জেলার বহু এলাকা সাগরের পলি মাটি এবং মুহুরী ও ফেনী নদী দিয়ে প্রবাহিত অতি বৃষ্টির কারণে বয়ে আনা পাহাড়ীয়া মাটির সংমিশ্রণে কালক্রমে ধীরে ধীরে ভূমি গঠিত হয়ে লোকালয় সৃষ্টি হয়। যেমন, আমাদের দেখা আশি দশক থেকে বিগত ৪০ বছরের মুহুরী সেচ প্রকল্প এলাকায় প্রায় ৩০,০০০ হাজার একর ভূমি জেগে ওঠে,বর্তমানে এই ভূমিতে শিল্প নগরী তৈরি কাজ চলমান। সাগর ভরে লোকালয় সৃষ্টির এলাকায় গুলিতে, ছোটকালে গ্রাম থেকে পশ্চিম ও দক্ষিণে বেড়ানো কালে কোনদিন মাটির তৈরি বাড়িঘর দেখতে পেতাম না, কারণ এখানের মাটি, সাগরের পলিমাটিতে সৃষ্টি , যাহা মাটির ঘর তৈরিতে উপযুক্ত নয় । পূর্ব ও উত্তরে দেখা যেত মাটির তৈরি সুন্দর সুন্দর বাড়িঘর কারণ এখানকার মাটি, ঘর তৈরি জন্য খুবই উপযুক্ত এবং এ মাটি সৃষ্টি হয় প্লায়োষ্টনিক সময় কালে। হিম যুগের শেষের দিকে, প্রচন্ড ঠান্ডায় আজকের ধনী ইউরোপ সহ সারা পৃথিবীর যখন কাঁপছিল, তখনও আমাদের বাংলাদেশ ততটা ঠান্ডা অনুভূতি হয়নি। সে যুগেও পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মনুষ্যতর প্রাণীরা বাংলাদেশে এসে ভিড় করেছিল। কালে কালে অত্রাঞ্চলের, অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পাহাড়-নদী ও সমুদ্রের সহাবস্থানে, সমুদ্রোপকূল অবস্থিতি, ব্যবসায়িক বিস্তৃতি, শস্যের পর্যাপ্ততা, সমুদ্র সম্পদ সংগ্রহ ও আদানপ্রদান সহজ হওয়ার কারণে, সম্পদের অবারিত আকর্ষণ ও শাসন করার অভিপ্রায় চট্টগ্রাম সহ এই অঞ্চলে এসেছে বিভিন্ন জাতি ও শাসকগোষ্ঠী। সেকালে, সারা বছর এদেশের লোকেরা চাষা করতো, বীজ বোনে, ক্ষেত গুলো শস্য সমৃদ্ধ ছিল। বছরে তিনবার ফসল ফলতো। জিনিস পত্রের দাম মোটামুটি সস্তা ও মানানসই। এদের লোকজনের আচার-আচরণে ও প্রথা পদ্ধতি গুলো পবিত্র ও ধর্মনিষ্ঠ। তারা নিজেদের গুণেই শান্তি ও সমৃদ্ধি অর্জন করেন। তাইতো, ইংরেজ , ঐতিহাসিক হান্টার পলাশী যুদ্ধ ও ইংরেজ শাসনের পূর্বে বলেছিল”এ দেশবাসীর পক্ষে গরিব হওয়া একরূপ অসম্ভব ছিল”। আর এ প্রাচুর্য ও সম্পদের কারণে অত্রাঞ্চলের সহজ সরল বসবাসকারীরা, পর্তুগীজ -হার্মাদ- মগ জলদস্যুদের দ্বারা ভয়াবহ বর্বরতা শিকার হতো। পর্তুগিজ-মোগল-মগ/হামার্দ লড়াই সর্বজনবিদিত। ক্ষমতা নানা পালা বদলে অত্রাঞ্চলে শাসন করে গেছে হরিকেল, আরকান, ত্রিপুরা রাজ্যের রাজাগণ, সুলতানি শাসন, মোগল শাসন, ইংরাজ শাসনের ও আরও বিভিন্ন শাসকদের শাসনাধীন ছিল। ১৩৪০ সালে সোনারগাঁয়ের স্বাধীন সুলতান ফখরুদ্দিন মুবারক শাহ চট্টগ্রাম, ফেনী ও ত্রিপুরা অঞ্চল বিজয়ের পর সর্বপ্রথম মুসলমান রাজ্যভুক্ত হয়। ইহার আরো আগে প্রায় ১২০০ খৃষ্টাব্দে পূর্ব পর্যন্ত এই অঞ্চলে শাসন করেছিল, বৌদ্ধ মহারাজাধিরাজ “হরিকেল” রাজ্যের রাজাগণ। ছাগলনাইয়া উপজেলায় পাঠাননগরে শিলুয়া গ্রামে প্রাচীন শিলা মূর্তির ধ্বংসাবশেষ উদ্ধারের মাধ্যমে, প্রাচীনকালে এই স্থানে বৌদ্ধধর্ম ও কৃষ্টি বিকাশ ঘটেছিল বলে ধারণা করা হয়। ১২০০ থেকে পরবর্তীতে মুসলিম ও মোগল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত আগে পর্যন্ত অঞ্চল শাসন করে গেছে আরকান ও ত্রিপুরা রাজ্যের রাজাগণ পরস্পরের সাথে লড়াই করে। ১৫৩৭ সালে মোগল সম্রাট হুমায়ুন সেনা নায়ক শের শাহ কতৃক বাংলা ও চট্টগ্রাম সহ অত্রাঞ্চল জয় করে মোগল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্তির করেন। ১৬০০ সালের আগ পর্যন্ত এখানে ছিল কৌম-সমাজের অস্তিত্ব। প্রাচীন জনবসতি গুলো ছিল পরস্পর বিচ্ছিন্ন ,অসংখ্য স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রাম-সমাজ। প্রথম দিকে মানুষ সমুদ্রে তীরবর্তী এলাকায় বসতি গড়লেও পরবর্তীতে এই সব এলাকায় জলদস্যুদের উৎপাত, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদিতে অতিষ্ট হয়ে তারা পরবর্তীতে তখনও এলাকায় হিসেবে চিহ্নিত না হওয়া “হালদা ও কর্ণফুলি নদী” এবং “ফেনী ও মুহুরী নদী” তীর বেষ্ঠিত অপেক্ষাকৃত বিশাল ভূখণ্ডে নিরাপদ এলাকা দিকে সরে গিয়ে বনজঙ্গলে ভরা থাকলেও, জঙ্গল পরিষ্কার করে বসবাস ও চাষাবাদ করে এবং মোগল শাসনামলে বহু বহিরাগত মুসলিম জনগোষ্ঠী এই সমস্ত এলাকায় এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে,কালক্রমে এই অঞ্চলে সমৃদ্ধিশালী ও ঐতিহ্যবাহী লোকালয় সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর কতৃক বাংলা দখল, শোষণ ও বঞ্চনার ইতিহাস সবার জানা, কিন্তু অনেকেই জানেনা, এই ক্ষুদ্র জনপদের ১৭৫৯ সনে একজন ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবী এবং ত্রিপুরা রোশনাবাদ পরগণার কৃষক বিদ্রোহের নায়ক, সীতাকুণ্ড থেকে, ফেনী, চৌদ্দগ্রাম ও ত্রিপুরা রাজ্যের রাজা ভাটির বাঘ শমসের গাজী, যিনি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির প্রতিহত করতে গিয়ে, নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। পরবর্তীতে ১৯৪৭ সালে পাক ভারত সীমান্ত নিধারিত হয়েছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্ম ভিত্তিতে। চম্পকনগর ও ত্রিপুরা দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার সত্বেও বাংলাদেশের সাথে যুক্ত না হয়ে, তৎকালীন সময়ে ভারতের সাথে যুক্ত হয়ে সীমানা নির্ধারণ হয়।

খবরটি অন্যদের সাথে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved dainikshokalerchattogram.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com