বুধবার, ০৬ জুলাই ২০২২, ০১:৩৮ অপরাহ্ন

শিরোনাম
চুয়েটে আজ উদ্বোধন হচ্ছে দেশের প্রথম আইটি বিজনেস ইনকিউবেটর আজ অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ-এর জন্মশতবার্ষিকী বিএনপি’র আন্দোলনের হুমকি নিয়ে আমাদের মাথা ব্যথা নেই: ওবায়দুল কাদের চামড়ার মূল্য নির্ধারণ সব কারাগার ও থানায় বায়োমেট্রিক পদ্ধতি চালু করতে হাইকোর্টের রায় মক্কা নগরীতে হজ্জ মেডিকেল সেন্টার পরিদর্শন করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সময়োপযোগী পরিবর্তনকে ধারণ করে পোশাক মালিকরা সমৃদ্ধ দেশ গঠনে অবদান রাখবে : স্পিকার অধিক ফসল উৎপাদন করার ও বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হবার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর জনগণের ভোটাধিকার রক্ষায় কাজ করছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সম্মেলন ৭ জুলাই

নারী নেতৃত্ব: প্রসঙ্গ রোকেয়া দিবস

মো. আবুল বশারসাম্যের গান গাই- আমার চক্ষে পুরুষ রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই। বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর , অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর। বিশ্বে যা-কিছু এল পাপ তাপ বেদনা অশ্রুবারি, অর্ধেক তার আনিয়াছে নর, অর্ধেক তার নারী। কোনো কালে একা হয়নি‘ক জয়ী পুরুষের তরবারী, প্রেরণা দিয়েছে, শক্তি দিয়েছে বিজয়লক্ষী নারী। কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা আজ বাস্তব। আমাদের সমাজে নারীদের অংশগ্রহণ পুরুষের সাথে সমান তালে অগ্রসরমান। নারীরা এখন নারীর জায়গায় নেই। নারীরা চার দেয়ালের মাঝে বন্ধি নয়। নারীরা এখন পুরুষের সহযোদ্ধা। পুরুষের সাথে তারাও সমাজ ও দেশের উন্নয়নে সমান অংশীদার।  বাংলার  মহীয়সী  নারী বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন নারীসমাজকে স্বাবলম্বী করার  বিষয়ে যে আহ্বান করেছিলেন  তা বিফলে  যায়নি । তাঁর আদর্শে ও আহ্বানে অনুপ্রাণিত হয়ে এদেশের নারী সমাজ হাটি হাটি পা পা করে দৃঢ়তার সাথে অনেকটা এগিয়ে এসেছে। এছাড়া নারী সমাজের অধিকার প্রতিষ্ঠাসহ সমাজের সকল স্তরে নারীর ক্ষমতায়ন এর পথ সুগম করার লক্ষে রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রয়াস অব্যাহত রয়েছে। নারীদের গ্রহণযোগ্যতা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায় সকল ক্ষেত্রে রয়েছে।রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের স্বপ্ন ছিল সমাজে নারী-পুরুষ সমান মর্যাদা আর অধিকার নিয়ে বাঁচবে। সেই স্বপ্নের কথাই তিনি লিখে গেছেন তাঁর গল্প-উপন্যাস-প্রবন্ধগুলোতে। নারীশিক্ষার প্রসারে কাজ করে গেছেন আমৃত্যু। নারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা, তাঁদের ক্ষমতায়ন, ভোটাধিকারের জন্য লড়াইটা এই বাংলায় রোকেয়াই শুরু করেছিলেন। ৯ ডিসেম্বর তাঁর জন্মদিন। ১৯৩২ সালের এই দিনেই মারা যান তিনি। দিনটি রোকেয়া দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। ১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর রংপুরের পায়রাবন্দে এক জমিদার পরিবারে রোকেয়ার জন্ম হয়। রোকেয়া খাতুন, রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, মিসেস আর এস হোসেন নামেও লিখতেন এবং পরিচিত ছিলেন তিনি। ঊনবিংশ শতকে নারীরা যখন অবরোধবাসিনী, সেই সময়ে নারীর পরাধীনতার বিরুদ্ধে তিনি আওয়াজ তুলেছেন।২০১৫ সারের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ৭০তম অধিবেশনে ১৯৩ টি দেশ ২০১৫-২০৩০ মেয়াদে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করে। দারিদ্র্যবিমোচন, ক্ষুধামুক্তি, অসমতা দূরীকরণ, জলবায়ু পরিবর্তনের ও এর প্রভাব মোকাবেলা করা, স্বাস্থ্য ও গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করা, জেন্ডার সমতা অর্জন এরং নারীর ক্ষমতায়ন ইত্যাদি অর্জনে ১৭ টি নতুন টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের ১৬৯টি লক্ষ্যমাত্রা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এসডিজি‘র ৫ নম্বর গোল ‘জেন্ডার সমতা অর্জন এবং নারী ও শিশুর অধিকার রক্ষায় নেতৃত্বদানকারী মন্ত্রণালয় এবং অন্যান্য লক্ষ্য অর্জণে সহায়ক মন্ত্রণালয় হিসেবে কাজ করে যাচ্ছ।নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ সূচক ব্যবহৃত হয় যেমন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, সম্পদ অর্জনের ক্ষমতা, আত্মোপলব্ধি ও অবলোকন, পরিবারের অর্থ লেনদেনে সম্পৃক্ততা, নিজের পারিপার্শিকতা পরিবর্তন ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা, প্রজনন বা জন্মশাসনে নিজে সিদ্ধান্ত নেওয়া ও বাস্তবায়নের ক্ষমতা, বিচরণের গন্ডির প্রসারতা ইত্যাদি।নারীর ক্ষমতায়নে বর্তমান সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ এবং সাম্প্রতিক সময়ের অর্জণসমূহ স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা, নারীর ক্ষমতায়ন, সবধরণের বৈষম্য দূর করে জেন্ডারসাম্য এবং সার্বিক উন্নয়নের মূলধারায় সম্পৃক্তকরণের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচী গ্রহণ করেছে।  নারীর প্রতি অগ্রমুখী কৌশল গ্রহণের ফলে নারীরা আজ রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেত্রী, স্পিকার, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি, বিচারপতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, প্রধানমন্ত্রীর মূখ্য সমন্বয়ক, মন্ত্রণালয়র সচিব, ডিসি, এসপি, পুলিশ, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও শান্তিবাহিনীতে অংশগ্রহণসহ ব্যবসায়ী এবং সফল উদ্যোক্তা। ২০৪১ সালে বাংলাদেশকে উন্নত দেশে পরিণত করার পাশাপাশি ওই সময় কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষের অংশগ্রহণ সমান-সমান করার অঙ্গীকার করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একইসঙ্গে বর্তমান বৈশ্বিক মহামারী করোনাভাইরাসের প্রেক্ষাপটে তাদের চাকরি রক্ষার আহ্বান জানিয়েছেন। নারীর সমতা, ক্ষমতায়ন ও অগ্রগতি নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অঙ্গীকার নবায়ন ও প্রচেষ্টা জোরদারেরও আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ২০৪১-এ কাজে নারী-পুরুষ সমান অংশগ্রহণ অঙ্গীকার প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের উচ্চ পর্যায়ের এক ভার্চুয়াল বৈঠকে যুক্ত হয়ে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৫তম বার্ষিক অধিবেশনের ফাঁকে ‘ফোর্থ ওয়ার্ল্ড কনফারেন্স অন উইমেন’-এর ২৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে এ উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেন, কোভিড-১৯ প্রেক্ষাপটে বিশ্বব্যাপী সাপ্লাই চেইনসহ অন্যান্য বড় বড় কর্মক্ষেত্রগুলোতে অভিবাসী শ্রমিকসহ নারী কর্মীদের অবশ্যই রক্ষা করতে হবে, যেন তারা আবারও প্রান্তিক ও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হন। নারী কর্মসংস্থানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও দুইটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, প্রতিটি মেয়ের কাছ থেকে বিশ্ব উপকৃত হতে পারে, যার সম্ভাবনা এরই মধ্যে উপলদ্ধি করা গেছে। তিনি বলেন, জেন্ডার সমতা ও নারীর ক্ষমতায়নে ১৯৯৫ সালের বেইজিং ডিক্লারেশন অ্যান্ড প্লাটফর্ম ফর অ্যাকশন একটি বড় ধরনের রোডম্যাপ তৈরি করেছে। এটি নারীর প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাপকভাবে বদলে দিয়েছে এবং ইতিবাচক উন্নয়নের অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। তখন থেকে প্রায় সব দেশে নারী ও মেয়েদের সুরক্ষায় আইনি কাঠামো গঠন করে। এজেন্ডাও সব লক্ষ্যে নারী ক্ষমতায়নকে স্বীকৃতি দিয়েছে। আমরা যেহেতু ডিকেড অব অ্যাকশনে প্রবেশ করেছি, তাই আমাদের অবশ্যই প্রতিশ্রুতি নবায়ন করতে হবে এবং নারী-পুরুষের সমতা, নারীর ক্ষমতায়ন ও অগ্রগতি নিশ্চিত করতে আমাদের প্রচেষ্টা বাড়াতে হবে। জাতিসংঘের উচ্চ পর্যায়ে নারী প্রতিনিধিদের অগ্রাধিকার দেওয়ায় জাতিসংঘ মহাসচিবকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নারী ক্ষমতায়নে বাংলাদেশের অসামান্য উন্নয়নের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, স্বাধীনতার পরপরই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশের উন্নয়ন এজেন্ডার কেন্দ্রবিন্দুতে নারীদের বসিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর অবিসংবাদিত নেতৃত্বে দেশে নারী-পুরুষ সমঅধিকারভিত্তিক একটি সংবিধান নিশ্চিত করা হয়। আমাদের উন্নয়ন কর্মকান্ডে নারীদের বাস্তবসম্মত প্রয়োজন পূরণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। আমাদের এই উন্নয়নে সমাজের সব স্তরের সব ধরনের মানুষকে অন্তর্ভুক্তির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, এ জন্যই আমরা শিক্ষার পাশাপাশি নারীর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে জোর দিয়েছি। আমরা নারীদের আমাদের উন্নয়নের সক্রিয় কর্মী হিসেবে বিবেচনা করি। এর অংশ হিসেবে সরকার ২০১১ সালে একটি প্রগতিশীল নারী উন্নয়ন নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। জাতীয় সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন ৫০টিতে উন্নীত করা হয়েছে। সংসদ নেতা, সংসদীয় উপনেতা, বিরোধী দলীয় নেত্রী ও স্পিকার সবাই নারী। শুধু তাই নয়, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় ৩০ শতাংশ আসন নারীদের জন্য নির্ধারণ করে রাখা হয়েছে। আর জনসেবাতে নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর জন্য বিশেষ বিধান রাখা হয়েছে।শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের নারীরা বাধা ভাঙছেন এবং বিভিন্ন ধরনের পেশায় সফল হচ্ছেন, যা আমাদের আগের প্রজন্ম কখনই কল্পনাও করতে পারত না। নারীর ক্ষমতায়নে সাফল্যের কারণে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাপী অনেক প্রশংসা অর্জন করেছে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের জেন্ডার গ্যাপ ইনডেক্স অনুযায়ী আমরা নারীদের সামগ্রিক ক্ষমতায়নে দক্ষিণ এশিয়ায় নেতৃত্ব দিচ্ছি। ১৪৯টি দেশের মধ্যে বিশ্বব্যাপী পঞ্চম স্থানে এবং রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে সপ্তম স্থানে রয়েছে। আমাদের আরও অনেক কিছু করার আছে। তারপরও নারীর ‘প্রকৃত মুক্তি’ হয়নি। আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে নারী-পুরুষের মৌলিক অধিকার স্বীকৃত হলেও প্রকৃতপক্ষে ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সমতার আইন স্বীকৃত হয়নি, নারীর ক্ষমতায়নের একটি প্রতীকী বৃদ্ধি ঘটেছে মাত্র।নারী-পুরুষের সম্মিলিত প্রয়াসে সমাজ, দেশ ও বিশ্বকে এগিয়ে নিতে রোকেয়া দিবসে শ্রদ্ধার সাথে স্বরণ করছি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব, নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, অটিজম বিশেষজ্ঞ সায়মা ওয়াজেদ হোসেন, শহিদ জননী জাহানারা ইমাম, বীর প্রতীক তারামন বিবি ও সেতারা বেগম সহ নিবেদিত প্রাণ ও প্রগতিশীল সকল মহিয়সী নারীদের ।

 পিআইডি ফিচার, লেখক: মো. আবুল বশার, তথ্য সহকারী, পিআইডি চট্টগ্রাম।    

 

খবরটি অন্যদের সাথে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved dainikshokalerchattogram.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com