বৃহস্পতিবার, ২১ অক্টোবর ২০২১, ০৭:২৭ পূর্বাহ্ন

দুদক কি পারবে উন্নয়ন বরাদ্দের দুর্নীতি রুখতে?

এখলাসুর রহমান

সম্প্রতি সংবাদপত্রে শিরোনাম হয়েছে- মহাসমুদ্রে আমি কাকে ধরবো: দুদক চেয়ারম্যান চিকিৎসকদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধে সরকারকে নোটিশ/দুর্নীতি ও প্রতারণার দায়ে নিজেদের এক কর্মচারীকে বরখাস্ত করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

নির্বাচনের পরপরই নবনির্বাচিত মন্ত্রীগণ বেশ জোরেসোরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের কথা বলে যাচ্ছেন৷ এমন সময় খবর বেরোলো দুর্নীতির সূচক বৃদ্ধি৷ বিদেশে টাকা পাচারে বাংলাদেশের দ্বিতীয় অবস্থানের খবর৷ সরকারের এই দুর্নীতিবিরোধী বক্তব্য কি সত্যিই দুর্নীতি দূরের জন্য নাকি কেবলই বলার জন্য বলা?

কারা দুর্নীতি দূর করবে? ২০০৯ সালে দুদকের মামলার নিস্পত্তি ছিল শতকরা ১৪ ভাগ৷ ২০১৮ সালে তা নেমেছে ৭-এ৷ অথচ এ সময়ে মামলা বেড়েছে ৪ গুণেরও বেশি৷ দুদক কেন এই মামলাগুলোর নিস্পত্তি করছে না? কে কার বিচার করে? দুদক কর্মচারীর বিরুদ্ধেও উঠে এসেছে দুর্নীতির অভিযোগ৷ বরখাস্ত হওয়া ব্যক্তির নাম আসাদুজ্জামান।

দুদক কর্মচারী আসাদুজ্জামানের  বিরুদ্ধে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হতে ঘুষ নেয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সম্প্রতি তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে। আসাদুজ্জামান যে প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ঘুষ নিয়েছেন, সেটির বিরুদ্ধেও ভ্যাট ফাঁকির মামলা রয়েছে।

ওই মামলার কথা বলেই প্রতিষ্ঠানকে ভয়ভীতি দেখিয়ে তিনি তাদের কাছ থেকে তিন দফায় ১০ লাখেরও বেশি টাকা নিয়েছেন বলে অভিযোগ। দুদকেরই গোয়েন্দা ইউনিটের পর্যবেক্ষণে তার এই দুর্নীতির তথ্য বেরিয়ে আসে।

রাজধানীর একটি রেস্তোরাঁ ও রমনা পার্কে তিনি প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে ওই অর্থ নিয়েছেন বলে দুদকের তদন্তে তা প্রমাণিত হয়৷ আসাদুজ্জামানের দুর্নীতির বিষয়টি নিয়ে দুদকের মহাপরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মাদ মুনীর চৌধুরী বলেন, ‘দুদকের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে গোয়েন্দা নজরদারি চলমান রয়েছে। অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে দুদক দৃঢ়প্রতিজ্ঞ৷

সংবাদপত্রে এই খবরও এসেছে যে বিদেশে টাকা পাচারের দিক হতে বাংলাদেশের স্থান দ্বিতীয়৷ বিদেশে টাকা পাচারে দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয় অবস্থানে এখন বাংলাদেশ। এক নম্বরে আছে ভারত। ওয়াশিংটন ডিসি ভিত্তিক সংস্থা গ্লোবাল ফাইনান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি (জিএফআই) এর প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে আসে।

সংস্থাটি জানায়, কেবল ২০১৫ সালেই বাংলাদেশ থেকে চার প্রক্রিয়ায় ৫ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে। যা প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার সমান। এ টাকার বেশিরভাগ বৈদেশিক বাণিজ্যে জালিয়াতির মাধ্যমে পাচার করা হয়। একই পদ্ধতিতে একই বছর দেশে ঢুকেছে ২ শ ৩৬ কোটি ডলারের সমপরিমাণ অর্থ।

বিদেশে টাকা পাচারে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের পরই বাংলাদেশের অবস্থান। জিএফআই’র মতে, উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের মোট বাণিজ্যিক লেনদেনের ১৭ দশমিক ৫ শতাংশই কোনো না কোনোভাবেই পাচার হচ্ছে৷

জিএফআই’র প্রতিবেদনে ২০০৬ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ১৪৮টি উন্নয়নশীল দেশের অর্থ পাচারের তথ্য উঠেছে। এ সময়ে উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে ১ ট্রিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে। ২০১৫ সালে টাকা পাচারে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে মেক্সিকো। ওই দেশ থেকে পাচার হয়েছে ৪ হাজার ২৯০ কোটি ডলার। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা মালয়েশিয়া থেকে ৩ হাজার ৩৭০ কোটি ছাড়াও ভিয়েতনাম থেকে ২ হাজার ২৫০ কোটি, থাইল্যান্ড ২ হাজার ৯০ কোটি, পানামা ১ হাজার ৮৩০ কোটি এবং ইন্দোনেশিয়া থেকে ১ হাজার ৫৪০ কোটি ডলার পাচার হয়েছে৷ কারা এসব পাচার করেছে? দুদক কি পারবে পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ও পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনতে?

সংসদে বিরোধী দলীয় উপনেতা জিএম কাদের বলেছেন, এখন এরশাদ আমলের চেয়ে দুর্নীতি বেশি হচ্ছে।

টিআইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুর্নীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ার ৮টি দেশের মধ্যে নিচের দিক থেকে সপ্তমে৷

দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলায় বিনা দোষে আটক জাহালমের মুক্তি সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়েছে৷ এদিকে জাহালমের মুক্তির শুনানিতে হাইকোর্ট বলেছে, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) যদি সঠিকভাবে কাজ না করে তাহলে আমাদের দেশে যে উন্নয়ন হচ্ছে তার স্থায়িত্ব থাকবে না। দেশ পাকিস্তান হতে বেশি সময় লাগবে না, আমাদের ভিক্ষা করতে (পথে) বসতে হবে। এই দেশের জন্য দুদকের মতো একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

আদালত বলেন, টিআইবি কি রিপোর্ট দিলো সেটা আমাদের কনসার্ন নয়, কারণ টিআইবি ভুল করতে পারে। কিন্তু ভুল তদন্তের দায় দুদকের এড়ানোর সুযোগ নেই। অর্থ আত্মসাতের মামলায় নিরপরাধ ব্যক্তিকে আসামি করার ঘটনার শুনানিতে বিচারপতি এফআরএম নাজমুল আহসান ও বিচারপতি কেএম কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ এমন মন্তব্য করেন৷ জাহালমের এই বিনাদোষে কারাবাসের দায় কার?

দেশে সবচেয়ে বড় ও ক্ষতিকর দুর্নীতি হচ্ছে উন্নয়ন বরাদ্দে৷ কোটি কোটি টাকা লোপাট হচ্ছে এসব খাতে৷ উন্নয়ন বরাদ্দের যথার্থ ব্যবহার ছাড়া কোনো দেশের উন্নয়নের শীর্ষে পৌঁছা সম্ভব নয়৷ কার মাধ্যমে কত কোটি টাকা বরাদ্দ ছাড় হয়েছে৷ কী কী খাতে ও কোন প্রক্রিয়ায় তা প্রয়োগ হয়েছে৷ দুদক কি পারবে খুঁজে বের করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে?

অজ্ঞতার কারণে যা হয় তাই হচ্ছে দেশে৷ সরকারি কোষাগার হতে যে যত বেশি টাকা ছাড় দিতে পারে তিনিই তত বেশি উন্নয়নের রূপকার হয়ে উঠছেন৷ তাকে রূপকার হিসেবে প্রচার করে চলছে লুটপাটকারীরাও৷ কারণ এমন রূপকারই তাদের পুঁজি বটে৷

সরকারি মাল দরিয়া মে ঢাল কথাটি উন্নয়ন বরাদ্দের খুবই সম্পৃক্ত৷ এসব লুণ্ঠিত বরাদ্দ উদ্ধার হলে দেশ সত্যিই উন্নয়নের শীর্ষে উঠবে৷ তাই নয় কি? দুদক কি পারবে দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা এই লুণ্ঠন প্রক্রিয়া বন্ধ করতে? আমরা চাই হাইকোর্টের ভিক্ষা করতে পথে বসা ও পাকিস্তানের মতো দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হয়ে ওঠার আশঙ্কা ব্যর্থ প্রমাণিত হোক৷ উন্নয়ন ও উন্নয়ন বরাদ্দ দুটো রক্তমাংসের জড়িয়ে থাকার মতো সম্পৃক্ত৷ উন্নয়নের একমাত্র পূর্বশর্তই হলো দুর্নীতিমুক্তভাবে উন্নয়ন বরাদ্দের সুষ্ঠু প্রয়োগ৷ দুদক কি পারবে তা? তারা পারবে কি পাচারকৃত অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে ও পাচারকারীদের চিহ্নিত করে তাদেরকে শাস্তির আওতায় আনতে?

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক

খবরটি অন্যদের সাথে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved dainikshokalerchattogram.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com